রুপেনা বেগম তার ১৪ মাস বয়সী মেয়ে টুম্পাকে কোলে নিয়ে ট্রলারের মাঝখানে বসেছিলেন। পাশেই ছিল তার আরও দুই মেয়ে। তারাও ছোট। হঠাৎ বাল্ক্কহেডের ধাক্কায় ট্রলারটি বাল্ক্কহেডের নিচে চলে যায়। ডুবে যান তারা।
গতকাল তুরাগ নদে ডুবে যাওয়া ট্রলারটির যাত্রী রুপেনা এর পরের ভয়াবহ চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সমকালকে তিনি বলেন, 'পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। কোলের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে অপর দুই মেয়েকে খুঁজছিলাম পানির মধ্যে। এরপরই কোলের সন্তান টুম্পাকে একজনের কাছে দিয়ে দিই, কিনারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। আবার দুই মেয়েকে খুঁজতে থাকি। কিছুক্ষণ পরই টুম্পার কান্না শুনতে পাই। তাকিয়ে দেখি টুম্পা কচুরিপানার ওপর বসে কাঁদছে। যে লোকটির কাছে ওকে দিয়েছিলাম, সে তাকে তীরে না নিয়ে কচুরিপানার ওপর ছেড়ে দেয়। পরে দুই সন্তানকে না পেয়ে ছোট মেয়ে টুম্পাকে কচুরিপানায় ভাসিয়ে ডাঙায় নিয়ে আসি।'

রুপেনার স্বামী মো. হোসাইনও ওই ট্রলারের যাত্রী ছিলেন। তিনি জানান, ছোট মেয়ে টুম্পাকে জীবিত ফিরে পেলেও তাদের দুই মেয়ে আট বছরের আলমিনা ও দুই বছরের ফারহা মনিকে জীবিত উদ্ধার করতে পারেননি তারা।

ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা দুপুরে ওই দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করেন। গতকাল শনিবার ভোরে এ ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে।

স্বজনরা জানান, হোসাইন ও রুপেনা বেগম শ্রমজীবী। তাদের বাসা আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রামের পূর্বপাড়ায়। সাভার থানার দ্বীপনগরে বালু ও কয়লা তোলার কাজ করেন তারা। তাদের তিন মেয়ে। বয়স ১৪ মাস থেকে আট বছরের মধ্যে। স্বামী-স্ত্রী কাজে যাবেন, শিশুসন্তানদের দেখবে কে? তাই প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে তিন শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কর্মস্থলে যান তারা।

গতকাল শনিবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিন মেয়েকে নিয়ে ওই দম্পতি তুরাগ নদ পার হওয়ার জন্য আমিনবাজারের পাড় থেকে যাত্রীবাহী ট্রলারে ওঠে?ন দ্বীপনগর যাওয়ার উদ্দেশে। সেখানে সন্তানদের পাশে রেখে স্বামী-স্ত্রী কাজ করেন।

দুর্ঘটনার সময় টুম্পা ছিল মায়ের কোলে, পাশে বসেছিল আট বছরের আলমিনা ও পাঁচ বছরের ফারহা মনি। তাদের বাবা হোসাইন ছিল দুই হাত দূরে। ট্রলারটি নদের মাঝখানে যেতেই একটি বাল্ক্কহেড ধাক্কা দেয়। আরেকটি বাল্ক্কহেড চাপা দেয় ট্রলারটি। ১৮ জন যাত্রী নিয়ে সেটি তলিয়ে যায় তুরাগের বুকে। ডুবে যান সবাই।

হোসাইন বলেন, 'ছোট মেয়েকে আমার স্ত্রী উদ্ধার করতে পারলেও দুই মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না। দুই সন্তানের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে ফিরতে হচ্ছে আমাদের। এর চেয়ে কষ্টের কী থাকতে পারে এই পৃথিবীতে।'