আদিবাসী হিসেবে আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দ্রুত, যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন কার্যকর করতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় ও তাদের ভূমি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে। সেই সঙ্গে আদিবাসীদের উপর সকল প্রকার নিপীড়ন ও নির্যাতন বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।  

দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত আদিবাসী মানবাধিকার সুরক্ষাকর্মীদের সম্মেলনে এমন দাবিগুলোই উঠে এসেছে তৃণমূল থেকে। ‘আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে এগিয়ে আসুন’ স্লোগানকে সামনে রেখে কাপেং ফাউন্ডেশন বুধবার ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সম্মেলনে উত্থাপন করা অন্য দাবিগুলো হলো- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০০৭ সালে গৃহিত আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র অনুসমর্থন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ বাস্তবায়ন ও ১৬৯ নং কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করা, আদিবাসী মানবাধিকার সুরক্ষাকর্মীদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার মিথ্যা ও হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহার করা, আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আদিবাসীদের প্রতি সহিংসতামূলক কার্যক্রম বন্ধ করা, আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, স্থানীয় আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া তাদের প্রথাগত ভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সামরিক-আধা সামরিক ঘাঁটি, পাঁচ তারকা হোটেল, ন্যাশনাল ইকোপার্ক, পর্যটন কমপ্লেক্স, লেইক, উন্নয়ন প্রকল্প বা সরকারি স্থাপনার নামে যে কোন ধরনের ভূমি অধিগ্রহণ বন্ধ করা ইত্যাদি। 

বুধবার সকালে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে সম্মেলনেরউদ্বোধন ঘোষণা করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, মানবাধিকার কর্মীরাই মানবাধিকার রক্ষা করেন। সংবিধানে সবার জন্যে মৌলিক অধিকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি সবাইকে মানবাধিকার সুরক্ষার নির্দেশনা মেনে চলার কথা উল্লেখ করেন।

আদিবাসীদের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়ন দরকার কিন্তু পাহাড়-প্রকৃতি পরিবেশ সর্বোপরি কোন একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ত্ব সংস্কৃতি জীবিকা ধ্বংস করে সেই উন্নয়ন কাম্য নয়। ভূমি থেকে উচ্ছেদ আদিবাসীদের  আদিবাসীদের জন্য বড় ঝুঁকি।

আদিবাসী নারীদের প্রতি সহিংসতা বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু আদিবাসী নারী নয়, মূলধারার নারীরাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন বন্ধের পক্ষে। এমনকি কমিশন শিশু কিশোরদের প্রতি চলমান যৌন নির্যাতন বন্ধেরও জন্যও কাজ করছেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত এ্যানি ভ্যান লিইয়েন বলেন, বাংলাদেশ একটি বহুজাতির ও বহুভাষার বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। নেদারল্যান্ড দূতাবাস বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করার জন্য দায়বদ্ধ।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদকসঞ্জীব দ্রং বলেন, এদেশের আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষ প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। সেই বঞ্চনার জায়গায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কাজ করছে যদিও তিনি কমিশনের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।

কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমার সভাপতিত্বে এতে স্বাগত বক্তব্য দেন কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী হীরামন তালাং।

এছাড়াও সম্মেলনের দিনব্যাপী আলোচনায় ২য় অধিবেশনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আইপিএইচআরডি সদস্যরা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে গিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে আইপিএইচআরডি নেটওয়ার্কের কাজ করা নিয়ে একটি কৌশলপত্র পরিকল্পনা তৈরি নিয়ে আলোচনা হয়।

বিকেলে সমাপনী অধিবেশনে একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এসময় বেসরকারি সংস্থা এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামছুল হুদা, সাবেক সাংসদ উষাতন তালুকদারসহ সারাদেশ থেকে আসা শতাধিক আদিবাসী মানবাধিকার সুরক্ষাকর্মী এবং দেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।