মজা করে বন্ধুকে বিকৃত নামে ডাকা, হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, রিকশাওয়ালাকে মারধরে বাধা দেওয়া ছিল তাদের 'অপরাধ'। সে অপরাধের 'মাশুল' হিসেবে প্রাণটাই দিতে হয়েছে তাদের। খোদ বন্ধু, সহকর্মী বা পরিচিতজনই তাদের হত্যাকারী। সামান্য কারণে অসহিষুষ্ণ হয়ে তারা এত বড় ঘটনা ঘটিয়েছে। ঢাকায় গত তিন মাসে সংঘটিত সাত কিশোর-তরুণ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক কারণ। সামাজিক পরিমণ্ডলে বাধাগ্রস্ত হয়ে মানুষ অসহিষুষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে তুচ্ছ কারণে খুনোখুনির মতো ঘটনা ঘটছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার ফারুক হোসেন সমকালকে বলেন, সামান্য কারণে মারধর-ছুরিকাঘাত, এমনকি মেরে ফেলার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটায়। তদন্তে দেখা যায়, এসব অপরাধের পেছনে কোনো পক্ষের লাভবান হওয়ার বিষয় ছিল না। সব ঘটনাতেই পুলিশ জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়েছে অথবা প্রক্রিয়া চলমান। তবে শুধু পুলিশি তৎপরতায় এসব বন্ধ করা যাবে না। সমাজের ভেতর অস্থিরতা থাকলে এমন নেতিবাচক মানসিকতা গড়ে ওঠে। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন, প্রচারাভিযানসহ নানামুখী প্রচেষ্টা দরকার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন মাসে তুচ্ছ কারণে অন্তত সাতটি খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে চারজনই শিশু-কিশোর। তাদের বয়স ১১ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। অপর তিনজন তরুণ। তারা সবাই শ্রমজীবী পরিবারের সদস্য। তাদের হত্যায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগেরই কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। নিতান্তই অকারণে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষিপ্ত বা উত্তেজিত হয়ে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ছয়টি ঘটনায় ছুরিকাঘাত ও একটিতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণ যায় চার শিশু-কিশোরের :৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে লালবাগের ডুরি আঙ্গুল লেনের একটি ভবনের ছাদে ১৫ বছরের হাফিজের রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, সমবয়সী কয়েক কিশোরের সঙ্গে তার বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল। চলার পথে প্রায়ই তাদের দেখা হতো। তখন দুষ্টুমি করে হয়তো কাউকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিত হাফিজ। আবার কাউকে নাম বিকৃত করেও ডাকত। এই দুষ্টুমিতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে 'উচিত শিক্ষা' দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বন্ধুরা। তাকে ডেকে নিয়ে পুরো শরীরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এতে জড়িত ছিল চার কিশোর। হাফিজ নিউমার্কেট এলাকায় ফেরি করে লুছনি বিক্রি করত।
এর তিন দিন পর ৬ সেপ্টেম্বর কামরাঙ্গীরচরে একই রকম তুচ্ছ কারণে সানোয়ার হোসেনকে (১৮) হত্যা করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা কামরাঙ্গীরচর থানার এসআই শিহাবুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বড়গ্রাম এলাকায় মাস্ক তৈরির কারখানায় কাজ করত সানোয়ার। ঘটনার আগে একদিন সে পায়ে ব্যথার কারণে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। তখন তার বন্ধু নূর আলম নূরা 'খোঁড়া' বলে ডাকায় সে রেগে যায়। বন্ধুকে চড় মারে সে। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে বিরোধের সূত্রপাত। এ কারণেই তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
এর পর ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুর এলাকায় মো. রিপন (১৬) নামে আরেক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। সে একটি শাড়ির দোকানে কাজ করত। কামরাঙ্গীরচর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা আনোয়ার সমকালকে বলেন, ঘটনার রাতে তার বন্ধুরা মোবাইল ফোনে কিছু দেখছিল। তাদের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাতে হাত থেকে ফোনটি কেড়ে নেয় রিপন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে বন্ধুরা। জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পরের মাসে যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পিটুনিতে মারা যায় রিয়াদ আহমেদ (১৪) নামে এক স্কুলছাত্র। ২০ অক্টোবর রাতে আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন তার মৃত্যু হয়। পুলিশ ও স্বজনের সূত্রে জানা যায়, ঘটনার আগে ওই এলাকায় দুই দল বখাটে ও মাদকাসক্ত কিশোরের মারামারি হয়েছিল। এর ঠিক পরপরই রিয়াদ নামাজ পড়ে ফিরছিল। তখন তাকে প্রতিপক্ষ ভেবে রড দিয়ে পেটায় বখাটেরা। সে স্থানীয় বিবির বাগিচা এলাকার সবুজ বিদ্যাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
তিন তরুণ খুনের নেপথ্যেও একই রকম বিরোধ :১১ নভেম্বর সহকর্মীর হাতে খুন হয় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কারখানার কর্মী শাকিল আহমেদ (২০)। পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকার অদূরে এ ঘটনা ঘটে। চকবাজার থানা পুলিশ জানায়, এক গ্রাহককে আগে পানি সরবরাহ করা নিয়ে সহকর্মী শিপনের সঙ্গে তার বিরোধ হয়। এর জের ধরেই হত্যাকাণ্ড ঘটে। জড়িত শিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে এক রিকশাচালককে মারধরে বাধা দেওয়ায় গত ২৮ অক্টোবর খুন হন রাকিব হোসেন (২২)। জুরাইনের আলমবাগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, ঘটনার দু'দিন আগে স্থানীয় এক সন্ত্রাসীর ভাই রিকশাচালককে মারধর করছিল। তা দেখে রাকিব এগিয়ে যান এবং বাধা দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষে বাগ্‌বিতণ্ডার জের ধরেই তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
আরেক ঘটনায় বন্ধুদের বিরোধের জের ধরে খুন হন মো. আকাশ (২০)। গত ২৫ অক্টোবর বংশালের সিক্কাটুলি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বংশাল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রেজাউল ইসলাম সমকালকে বলেন, এক বছর আগে তুচ্ছ বিষয়ে বিরোধের জের ধরে লক্ষ্মীবাজারে আকাশ ও তার বন্ধুদের মারামারি হয়। সে ঘটনার জের ধরে এতদিন পর তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
কারণ অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রয়োজন :মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক সমকালকে বলেন, মানুষের আগ্রাসী মনোভাব বেড়েছে; কমেছে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতিবোধ। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক কারণ। সামাজিক বৈষম্যগুলো ব্যক্তির ওপর মানসিক চাপ তৈরি করছে। সামাজিক পরিমণ্ডলে বাধাগ্রস্ত হয়ে সে অসহিষুষ্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানুষের অনুভূতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। মানসিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মানুষ এখন আর খুন-বীভৎসতা দেখে বিচলিত হয় না। সবাই 'হিরোইজম' দেখাতে চায়। ফলে তুচ্ছ কারণে খুনোখুনির মতো ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও গবেষণা করে সমাধানমূলক পথ দেখানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের।