গণপরিবহনে হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে প্রজ্ঞাপন না হলে বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সড়ক ছাড়েন তারা। এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এদিকে বাস মালিকদের ভাষ্য, তারা অর্ধেক ভাড়া নেবেন, সেক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। না দিলে তাদের লোকসান হবে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত শিক্ষারই অংশ। তাই ভর্তুকি সরকারকে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে হিসাবে সমস্যা। কোন বাসে কতজন শিক্ষার্থী চড়েছে তার হিসাব রাখার ব্যবস্থা নেই। কাকে কীভাবে ভর্তুকি দেবে সরকার?
কীভাবে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করা যায়- এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কিছু বলছে না। তবে সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বেসরকারি মালিকদের ওপর অর্ধেক ভাড়া চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে হাফ পাসের দাবিতে গতকালও বেলা ১১টার দিকে ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে পুরো এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। হাজারো মানুষ গাড়ি ছেড়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান। বেলা ২টার দিকে অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গতকাল বাস ভাঙচুরের মতো ঘটনা না ঘটলেও একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের জেরে ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা করে বলে অভিযোগ এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হাফ পাসের দাবিতে আন্দোলন করা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা কলেজের এক ছাত্রের মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী আন্দোলনকারীদের লাঠি, ব্যাট, স্টাম্প দিয়ে পেটায়।
আইডিয়ালের এক ছাত্রকে পাঁচ ঘণ্টা ঢাকা কলেজে আটকে রাখার পর সন্ধ্যায় শিক্ষক ও পুলিশের মধ্যস্থতায় ছাড়া হয়। ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি নেই। তাই হামলাকারীদের সাংগঠনিক অবস্থান জানা যায়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহেন শাহ মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি হয়েছিল। দুই পক্ষকেই শান্ত করে নিজ নিজ কলেজে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে সকাল থেকে ঢাকা কলেজের সামনে মিরপুর রোডের নিউমার্কেট থেকে ল্যাবএইড হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কে শিক্ষার্থীরা জমায়েত হতে শুরু করেন। তারা স্লোগান দেন, 'হাফ পাস নয় আবদার/ আমাদের অধিকার।'
ঢাকা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আসিফ ইসলাম জানান, তার বাসা বনশ্রীতে। কলেজ পর্যন্ত আসতে ভাড়া ২৫ টাকা। আসা-যাওয়ায় ৫০ টাকা লাগে। আগে লাগত ৩০ টাকা। বাসের ভাড়া বৃদ্ধিতে মাসে ৪০০-৫০০ টাকা খরচ বেড়েছে। তার পরিবারের পক্ষে এ ব্যয় মেটানো কঠিন। বাসে হাফ ভাড়া দিতে চাইলে চালক-হেলপাররা দুর্ব্যবহার করেন। সরকারকে আইন করতে হবে, যাতে সবসময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ১১ দফার অন্যতম দাবি ছিল গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া। স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার তা মৌখিকভাবে মেনে নেয়। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশে হাফ ভাড়ার বিষয়টি রাখা হয়নি। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনেও হাফ পাস বলে কিছু নেই।
ডিজেলের দাম বাড়ায় গত ৮ নভেম্বর থেকে বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ভাড়া বৃদ্ধি চাপ তৈরি করেছে শিক্ষার্থীদের ওপর। ভাড়া নিয়ে বাসে বচসা, মারামারি লেগেই রয়েছে। তাই শিক্ষার্থীরা সপ্তাহখানেক ধরেই সড়ক অবরোধ করছেন হাফ পাসের দাবিতে।
সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকার শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক। কিন্তু আইনে হাফ পাস বলে কিছু নেই। তাই সরকারের পক্ষে বাস মালিকদের বাধ্য করা সম্ভব নয়। বাস পরিচালনা তাদের ব্যবসা। অর্ধেক ভাড়া নিলে তাদের লোকসান হবে। সরকার কারও লোকসান করাতে পারে না।
সচিব জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছে মন্ত্রণালয়। মালিকরা বলেছেন, হাফ ভাড়াকে বৈধতা দিলে সব যাত্রীই কম ভাড়া দিতে চাইবে। কে ছাত্র আর কে অছাত্র তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে। এতে গণপরিবহনে সমস্যা আরও বাড়বে।
ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় ঢাকার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ৪৫ পয়সা বাড়িয়ে দুই টাকা ১৫ পয়সা করেছে সরকার। মালিকদের দাবি ছিল দুই টাকা ৪৯ পয়সা করার। সচিব বলেন, জনসাধারণের কথা চিন্তা করেই মালিকদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে ও মন্ত্রীর অনুরোধে দুই টাকা ১৫ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। তাদের আরও চাপ দিলে হয়তো বাস বন্ধ করে দেবে। এতে বিড়ম্বনা ও জনদুর্ভোগ হবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, যেসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি, সেই রুটের বাসে ভাড়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। যেমন ধানমন্ডির সাত মসজিদ সড়ক থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত আটটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি বড় কলেজ এবং দুটি বিদ্যালয় রয়েছে।
মোহাম্মদপুর থেকে নিউমার্কেট রুটে চলা ৩৬ নম্বর বাসের মালিক হাজি নুর আলী সমকালকে বলেন, সকালে ও বিকেলে তার বাসের ৭০ শতাংশ যাত্রী থাকে শিক্ষার্থী। তাদের কাছ থেকে কম ভাড়া নেওয়া হয়। অর্ধেক নিলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। রোববার জিগাতলায় এ বাসের চেকার আল-আমিন সমকালকে দেখান, মোহাম্মদপুর থেকে আসা একটি বাসে ৩৮ জন যাত্রীর ২১ জনই শিক্ষার্থী।
এ রুটের বাস মালিকরা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্রধারীদের কাছ থেকে তারা কম ভাড়া নেন। অন্য পেশার লোকজনও ভুয়া পরিচয়পত্র বানিয়ে ছাত্র সেজে অর্ধেক ভাড়া দিতে চায়। গভীর রাতেও ছাত্র পরিচয়ে অন্য পেশার যাত্রী হাফ পাস চায়। এ নিয়ে বিপত্তি হয়।
ছাত্রদের দাবির বিষয়টি কীভাবে সুরাহা করা যায়, এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার এবং মুখপাত্র মাহবুব-ই রাব্বানীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ডিজেল, যন্ত্রাংশ সব কিছুর দাম বেড়েছে। শ্রমিকদের মজুরিও বাড়াতে হবে। সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, তাতে মুনাফা করাই মুশকিল। অর্ধেক ভাড়া নিলে লোকসান হবে। তবে সরকার ভর্তুকি দিলে হাফ পাস সম্ভব।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক সমকালকে বলেছেন, পরিবহনে সুশৃঙ্খল হলে হাফ পাসের দাবিই করতে হতো না। উন্নত দেশে শহরে নির্দিষ্ট 'এডুকেশন জোন (শিক্ষা এলাকা)' থাকে। যেখানে সব স্কুল কলেজ থাকে। ঢাকা শহরের মতো স্কুল কলেজ সব হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ছাত্র থাকে উত্তরা, পড়ে সায়েন্সল্যাবে। বাসে চড়তে হয়। যানজট হয়। অপরকিল্পনার দায় সরকারের। সুতরাং সরকারকেই ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু শত শত বাস কোম্পানি, শত শত মালিক। কীভাবে ভর্তুকি দেবে তার ব্যবস্থাপনাও কঠিন।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান সমকালকে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের একটি উপায় হলো বাস রুট র‌্যাশনালাইজ (বিআরআর) করা। কিন্তু ছয় বছর ধরে এ নিয়ে শুধু আলোচনাই হচ্ছে। বিআরআর হলে হিসাব থাকবে কোন রুটে কতজন শিক্ষার্থী ভ্রমণ করছে।
সড়ক পরিবহন সচিব বলেন, ভর্তুকি নয়, সরকার বিআরটিসির বাস শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে দিতে পারে। কিন্তু বিআরটিসি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হলেও একটি করপোরেশন। হাফ ভাড়া নিলে তাদেরও লোকসান হবে।
ঢাকা শহরের বিআরটিসির সাড়ে ৬০০ বাসের মধ্যে দুই শতাধিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইজারা দেওয়া। এসব বাসে শিক্ষার্থী ও কর্মীরা যাতায়াত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সুবিধা থাকায়, হাফ ভাড়ার আন্দোলনে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নেই। ২০১২ সালে বিআরটিসি স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য বাস চালু করলেও যাত্রী সংকট ও লোকসানে তা বন্ধ হয়েছে।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালু করেছে পুরান ঢাকা থেকে চলা বাস মালিকরা। গতকাল জবির প্রক্টর মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে মালিক, শিক্ষার্থী ও পুলিশের যৌথ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। প্রক্টর বলেন, শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে অর্ধেক ভাড়ায় চলতে পারবেন। সর্বনিম্ন ভাড়া হবে পাঁচ টাকা।



বিষয় : বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবি

মন্তব্য করুন