ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

মডেল ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ

মডেল ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ

ফাইল ছবি

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৩:১৮ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৩:৩৭

বেসরকারি চাকরিজীবী আসিফ চৌধুরী থাইরয়েডজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতিনিয়ত ওষুধ সেবন করেন। গত ২৪ নভেম্বর রাজধানীর মহানগর প্রজেক্টে অবস্থিত মডেল লাইফ ফার্মেসি থেকে চার ধরনের ওষুধ নেন। দু’দিন ওষুধ সেবনের পর হঠাৎ আসিফ লক্ষ্য করেন, দুটি ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে এক মাস আগে। তিনি জানান, এখন মডেল ফার্মেসিতেও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। অথচ মডেল ফার্মেসি গড়ে উঠেছিল নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধে। সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে ওষুধ কিনবে? 

আসিফের মতো অভিজ্ঞতা হয়েছে আরও অনেকের। গত ১ ডিসেম্বর রাজধানীর আজিমপুর মডেল অ্যাবাকাস ফার্মেসি থেকে ব্যবসায়ী রিয়াজ উদ্দিন কাশির ওষুধ নিতে যান। রিয়াজ হাতে ওষুধ নিয়ে লক্ষ্য করেন গত এপ্রিলে এর মেয়াদ শেষ হয়েছে। 

আসিফ ও রিয়াজ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়ে কোনো অভিযোগ করেননি। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কল সেন্টারে গত তিন মাসে মেয়াদোত্তীর্ণ, বাড়তি দাম এবং নিম্নমানের ওষুধ-সংক্রান্ত এমন ৫১৩টি অভিযোগ এসেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ দোকানে থাকার পরও বিক্রি না করা এবং ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় স্যালাইনের মাত্রাতিরিক্ত দাম নেওয়ারও অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগের একটি বড় অংশ রাজধানীর বিভিন্ন মডেল ফার্মেসির বিরুদ্ধে।

সরকার মানসম্পন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতে ২০১৭ সালে মডেল ফার্মেসি চালুর উদ্যোগ নেয়। এসব ফার্মেসিতে ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ, নিম্নমানের ওষুধ না রাখা ও সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণে অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। দেশে বর্তমানে আড়াই হাজারের বেশি মডেল ফার্মেসি আছে; যার সিংহভাগ ঢাকায়। এর পরও মডেল ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কল সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বরেই ওষুধ ও স্যালাইন সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে ২৪৫টি। ওই মাসে দেশে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও রোগী শনাক্তের তথ্য দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে সময় সারাদেশে স্যালাইন সংকট দেখা দিয়েছিল। পরের মাসে ওষুধ-সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে ১৬৬টি এবং নভেম্বরে ১০৫টি। এ ছাড়া এই তিন মাসে ওষুধ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় জানতে চেয়ে ফোন করেছেন ১৫৩ জন। এসব অভিযোগের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর। বাকি অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি এখনও প্রক্রিয়াধীন। 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত ছয় মাসে তাদের অভিযানে শাহবাগ, শ্যামলী, মুগদাসহ রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় বেশ কিছু ফার্মেসিকে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ, নিম্নমান, ভেজাল, অতিরিক্ত দাম, সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ রাখা হচ্ছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। প্রায় সব ফার্মেসিতেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মিলেছে। অনেক দোকানে ভেতরে না ঢুকেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ চোখে পড়েছে। এমনকি প্যাকেটের গায়ে নতুন টোকেন লাগিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। 

অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, ‘গত এক বছরে অভিযানে যেসব ফার্মেসি পরিদর্শন করা হয়েছে তার বড় একটি অংশেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে। গত মাসে রাজধানীর শতাধিক ফার্মেসিতে অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে মডেল ফার্মেসিও আছে। এমনও হয়েছে, একটি ফার্মেসিতে ঢুকেই ওষুধ রাখার বাক্সে হাত দিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পেয়েছি। কিন্তু তাদের সেটি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা এখন তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি, এটি ভয়াবহ অন্যায় ও অসৎ চর্চা। এমনকি চিকিৎসকের জন্য নমুনা হিসেবে দেওয়া ওষুধগুলোও দোকানে চলে আসে। সে ওষুধগুলোতে মেয়াদের তারিখ দেওয়া নেই।’

সাধারণত ফার্মেসির নিবন্ধন দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গত বছরের ডিসেম্বরে সংস্থাটি প্রকাশিত ২০২১-২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে এখন মোট ফার্মেসির সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজার ৪৮৬টি। শুধু গত বছরের জুন থেকে গত নভেম্বর পর্যন্ত ৪৬ হাজার ৮৭৯টি ফার্মেসিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে নিবন্ধন ছাড়াই ৫০ হাজারের বেশি ফার্মেসি আছে। যদিও এদের বিরুদ্ধে এখনও বড় কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে। জানা গেছে, গত এক বছরে সংস্থাটি ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রাখার অভিযোগে আড়াই হাজারের বেশি মামলা করেছে। আদায় করা হয়েছে ৩ কোটি ২৪ হাজার টাকা জরিমানা। বাতিল করা হয় সাতটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ফার্মেসির মাধ্যমে সিংহভাগ ওষুধ মানুষের হাতে যায়। তাই সেখানে ওষুধ সংরক্ষণ, বিতরণ বা বিপণন ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেয়াদ শেষ হলে ওষুধের গুণগতমান নষ্ট হয়ে যায়, যা সেবন মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমনকি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হতে পারে মৃত্যু পর্যন্ত। বিশ্বজুড়ে ফার্মেসি পরিচালনার ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থাপনা ও নিয়ম রয়েছে, তা আমাদের দেশে দেখা যায় না। এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তদারিক ও তৎপরতা নেই।’ 

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মুখপাত্র নুরুল আলম বলেন, ‘ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আমাদের প্রশাসন। আমাদের একটি টিম সবসময় বাজার তদারকি করছে। যারাই অপরাধ করুক, ছাড় দেওয়া হবে না। গত এক বছরে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই মডেল ফার্মেসি। এমনকি সাত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×