রাজধানীর মিরপুর সংলগ্ন বাউনিয়া বাঁধের পাশে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জায়গায় টিনশেড ঘর তুলে বসবাস করতেন খোদেজা বেগম। রিকশাচালক স্বামীর আয়ে তাদের সংসার চলত। খোদেজার মতো আরও অনেকেই সেখানে বাস করতেন। কেউ রিকশা চালান, কেউ ওয়ার্কশপে কাজ করেন। কেউবা গৃহকর্মী বা দর্জি দোকানের কর্মচারী। বছর চার-পাঁচ আগে বুলডোজার দিয়ে তাদের বস্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জানানো হয়, উচ্ছেদ হওয়াদের ওই জায়গাতেই ফ্ল্যাট নির্মাণ করে দেওয়া হবে। বস্তিবাসীরা ফ্ল্যাটে থাকবেন। ভুক্তভোগীরা আশায় বুক বাঁধেন। বছর খানেক বাদেই সেখানে পাঁচটি ১৪ তলা ভবনের কাজও শুরু হয়। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করেন বস্তিবাসীরা। গত ৩ আগস্ট ৩০০ বস্তিবাসীকে সেখানে থাকার বরাদ্দপত্র দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে এখন তারা থাকতে চান না। এখন পর্যন্ত কেউ ফ্ল্যাটে ওঠেননি।

বরাদ্দপ্রাপ্তরা জানান, ফ্ল্যাটে থাকতে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা মেনে তাদের পক্ষে থাকা সম্ভব না। মাসিক ভাড়া ধরা হয়েছে সাড়ে চার হাজার টাকা। ওঠার সময় দুই মাসের ভাড়া অগ্রিম দিতে হবে। এর সঙ্গে থাকবে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল। পাইপলাইনে কোনো গ্যাস দেওয়া হবে না। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হবে। থাকবে নিরাপত্তাকর্মী, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও কমন বিদ্যুৎ বিল। এর সঙ্গে আছে সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স ও ঢাকা ওয়াসার স্যুয়ারেজ বিল। সব মিলিয়ে তাদের খরচ হবে প্রায় ১০ হাজার টাকা। প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে এই টাকা জমা দিতে হবে। তবে মাসিক ভাড়া দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক ভিত্তিতে জমা দেওয়া যাবে। তবে সব মিলিয়ে মাসিক ১০ হাজার টাকা দিয়ে তাদের পক্ষে ওই ফ্ল্যাটে থাকা একেবারেই অসম্ভব।

শর্ত আরও যা আছে: ফ্ল্যাট বরাদ্দপ্রাপ্তদের ভাড়াভিত্তিক চুক্তিপত্র দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচের বেশি হলে তারা ফ্ল্যাটে থাকতে পারবেন না। প্রথমে এক বছরের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে ভাড়া দেওয়া হবে। এ সময়ে ভাড়াটিয়া ওপরের শর্তগুলো শতভাগ মেনে চললে পরবর্তীতে পাঁচ বছরের জন্য নতুন ভাড়ার চুক্তি হবে। অন্যথায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ফ্ল্যাটের দখল নেবে। বরাদ্দপ্রাপ্তরা ফ্ল্যাট অন্য কাউকে ভাড়া দিতে পারবেন না। কাউকে সাবলেট হিসেবেও রাখতে পারবেন না। এটা করলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা অন্যান্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়মিত ভাড়া বা সর্বোচ্চ দুই মাসের ভাড়া বকেয়া পড়লে তাকে উচ্ছেদ করে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ফ্ল্যাটের দখল নেবে। এ রকম আরও অনেক শর্ত মেনে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করতে হবে।

গত সোমবার সরেজমিন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে বরাদ্দপ্রাপ্তদের খোঁজ করতেই এক দোকানি পাশের কলাবাগান বস্তি দেখিয়ে দেন। তিনি বলেন, বস্তিতে গেলেই অসংখ্য ফ্ল্যাটের মালিক পাবেন। তার কথা ধরে বস্তিতে ঢুকে ইব্রাহিম নামে এক ছোট্ট দোকানিকে জিজ্ঞাসা করতেই বলেন, 'আমিও একটা ফিলাট পাইছি। কিন্তু ফিলাটে থাকার ক্ষ্যামতা মোর নাই।' কারণ কী জানতে চাইলেই তিনি অন্য বরাদ্দপ্রাপ্তদের ডাকতে শুরু করেন। বলেন, 'তাদের কাছে ভালো কইরা হুনেন।'

মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডাক দিতেই সেখানে জনাদশেক বরাদ্দপ্রাপ্ত হাজির হন। একেকজন তাদের ক্ষোভ উগরে দেন। মোহাম্মদ রফিক নামে একজন বলেন, আমি একটি বাসায় নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করি। বেতন পাই আট হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে পুরো পরিবারের কোনোভাবে মাস চলে যায়। পুরো মাসের বেতন দিয়েও তো ফ্ল্যাটের ভাড়া হবে না। তাহলে ফ্ল্যাটে থাকব কীভাবে?

মোমেলা খাতুন নামে আরেকজন জানান, তিনি একটি দর্জির দোকানে রিফুর (সেলাই-ফোঁড়াই) কাজ করেন। আর তার স্বামী মিস্ত্রির কাজ করেন। পাঁচজনের পরিবার। মাসে দু'জনের আয় হয় বড়জোর ১৫ হাজার টাকা। ১০ হাজার টাকা যদি ভাড়াতেই চলে যায়, তাহলে সংসার চলবে কীভাবে?

ইব্রাহিম নামে আরেকজন বলেন, 'গরিব মাইনসের জন্য এই ফ্যালাট না। হাউজিংয়ালারা আমাদের লগে গাদ্দারি করছে।'

কলাবাগান বস্তিতে বসবাসকারীরা জানান, যারা উচ্ছেদের শিকার হয়েছিলেন, তারাই ঘর তুলে সেখানে থাকেন। এ জন্য তাদের কোনো ভাড়াও দিতে হয় না। কারণ যার যার ঘর তারা নিজে তুলে বসবাস করছেন। এটাও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষেরই জায়গা। এখানে কেবল বিদ্যুতের বিল দেওয়া লাগে। কোনো ভাড়া দেওয়া লাগে না। এত ভাড়া দিয়ে তাদের কারও ওই ফ্ল্যাটে ওঠার সামর্থ্য নেই।

কাজ শেষ হওয়ার আগেই বরাদ্দ: জানা যায়, বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের জন্য ২০১৬ সালের দিকে মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধের স্লুইস গেট এলাকায় পাঁচটি বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ওই এলাকায় দীর্ঘদিনে বড় বস্তি গড়ে উঠেছিল। এ জন্য প্রথমে বস্তিবাসীদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ২০১৮ সালের জুন মাসে এসব ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে সেখানে পাঁচটি ১৪ তলা ভবন গড়ে উঠেছে। প্রথমে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১০০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে বাড়িয়ে করা হয় ১৩১ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি ভবনের কাজও শেষ হয়নি। গত ৩ আগস্ট তিনটি ভবনের ৩০০টি ফ্ল্যাট বস্তিবাসীর কাছে ভাড়া-বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই তিনটি ভবনের কাজও সম্পন্ন করতে আরও প্রায় এক বছর লাগবে বলে জানান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাই।

সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রত্যেকটি ভবনের ১৪ তলা পর্যন্ত অবকাঠামো উঠে গেছে। ভবনগুলোতে কমন স্পেসসহ ৭২০ ও ৬৭৩ বর্গফুট আয়তনের দুই ধরনের ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে রয়েছে দুটি আবাসিক কক্ষ, একটি বারান্দা, একটি ড্রইং-কাম ডাইনিং রুম ও একটি টয়লেট ও একটি বেসিন স্পেস। প্রতিটি ভবনে রয়েছে দুটি করে লিফট ও তিনটি করে সিঁড়ি। ভবনগুলোর নিচতলায় রয়েছে কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, গার্ড রুম, টয়লেট ও ওপেন স্পেস। সামনে রয়েছে গার্ডেনিংয়ের স্পেস ও কিছু উন্মুক্ত স্থান। সামনেই রয়েছে প্রশস্ত একটি সড়ক। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বেশ দৃষ্টিনন্দনই হবে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

কর্তৃপক্ষ যা বলে: জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মিরপুর অঞ্চলের (ঢাকা ডিভিশন-১) নির্বাহী পরিচালক ও এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক জোয়ার্দার তাবেদুন নবী সমকালকে বলেন, প্রথমে ভাড়া ধরা হয়েছিল মাসিক সাত হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেটা কমিয়ে সাড়ে চার হাজার টাকা করা হয়েছে। আর কাজে বিলম্ব হওয়ার পেছনে কিছু আর্থিক সংকট ছিল। এ ছাড়া করোনা মহামারিও ছিল। পরে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা ছিল। এ সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে না। এ জন্য আগামী জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। বরাদ্দপ্রাপ্তদের ফ্ল্যাটে ওঠা নিয়ে অনাগ্রহ প্রসঙ্গে বলেন, যারা বস্তিতে থাকে তারা একটা কক্ষেরই মাসে দুই হাজার টাকা ভাড়া দেন। সেটা তুলনা করলে সাড়ে চার হাজার টাকা তো বেশি না। পাশাপাশি তারা অনেক ভালো পরিবেশ পাবে। এটাও তো দেখা প্রয়োজন।

আগামী জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবেন কিনা জানতে চাইলে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মল্লিক এন্টারপ্রাইজের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সোহেল বলেন, মূল অবকাঠামো তো উঠে গেছে। এখন আর বেশি দেরি হবে না। প্লাস্টার-ফিনিশিংয়ের কাজ দ্রুতই করা হচ্ছে।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হায়দার বলেন, বস্তিবাসীর ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন ভবনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেক আলোচনা করেই ভাড়াভিত্তিক ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কারণ, স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হলে ফ্ল্যাটের আশায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেকেই ঢাকা চলে আসবেন। তাই স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। বরাদ্দপ্রাপ্তদের কেউ যদি থাকতে না চান, তাহলে বস্তির অন্য বাসিন্দাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হবে।