ঢাকায় দু'দিনের বিশ্ব শান্তি সম্মেলনের সমাপনী দিনের প্যানেল আলোচনায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ধর্মীয় চরম পন্থা সমাজে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তারা বলেছেন, পরমতসহিষ্ণুতার মাধ্যমে ধর্মীয় এবং জাতিগত বিভাজন রেখা দূর করতে হবে। বিশ্বে শান্তি থাকলে সবাই এর সুফল পায়। অশান্তি বাড়লেও সবাইকে তার ফল ভোগ করতে হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা এবং বিশ্ব শান্তি সম্মেলন আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বলেন, ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন।

'পিস থ্রো ইন্টার-ফেইথ ডায়ালগ, কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ' শিরোনামের এ প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মন্ত্রী হন ফিলিপ রুডক, সংযুক্ত আরব আমিরাতের গ্লোবাল কাউন্সিল ফর টলারেন্স অ্যান্ড পিসের প্রেসিডেন্ট আহমেদ মোহামেদ রশিদ আলজারওয়ান আলশামসি, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনার সোহা ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. কারেন জুংব্লুট, এথেন্সের ন্যাশনাল অ্যান্ড কাপোডিস্ট্রিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'র গ্রিস ভাষায় অনুবাদক দিমিত্রিওস ভাসিলিয়াডিস এবং পোল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারশর অধ্যাপক মিশাল পানাসিউক। সভা সঞ্চালনা করেন জেনেভায় ইউএন ইউনিভার্সিটি ফর পিস টু দ্য ইউএন অফিস অ্যান্ড আদার ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের স্থায়ী পর্যবেক্ষক ডেভিড ফার্নান্দেজ পুয়ানা।

আলোচনায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। তার সারাজীবনের সংগ্রামের মূল দর্শন ছিল ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা। তিনি সংলাপে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সব সময় শান্তি চাইতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শান্তি অর্জন হলে সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে।

তিনি বলেন, সমতা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সহিষ্ণুতা এবং বন্ধুত্বই শান্তি দিতে পারে। ধর্মীয় চরমপন্থা সমাজে অসহিষ্ণুতার বাড়ার অন্যতম প্রধান কারন। এ কারনে চরমপন্থার পরিবর্তে উদার দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তুলতে হবে এবং পররস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে হবে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবার অবদান রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কারনে অকারনে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে শত্রুতা বাড়ানোর কোন যৌক্তিকতা নেই। বরং প্রতিবেশীদের সঙ্গে যতটা সম্ভব বন্ধুত্ব বাড়াতে হবে। বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই শান্তিময় সুন্দর আগামী গড়ে ওঠারও প্রত্যাশা করেন তিনি।

অষ্ট্রেলিয়ার সাবেক মন্ত্রী ফিলিপ রুডক বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে মানুষ ন্যায়বিচার ও সম অধিকারের জন্য লড়াই করে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা বিপন্ন মানুষদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ আরও একবার মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপক ড.কারেন জুংব্লুট বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার মনোভাব নিয়ে বিশ্বকে এগিয়ে যেতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্য রাখা যাবে না। গ্রিসের অধ্যাপক দিমিত্রিওস ভাসিলিয়াডিস বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন এই মহান নেতার মানুষের জন্য ভালবাসা ও শান্তির জন্য আকাংখা দেখে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিতে পারে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।

'পিস অ্যান্ড ইমার্জিং গ্লোবাল ট্রেন্ডস' শিরোনামে দিনের দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন ইউনিভার্সিটি অব কলম্বোর উপাচার্য অধ্যাপক চন্দ্রিকা এন উজারটিন। আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা এবং জর্জ ম্যাশন ইউনিভার্সিটির জেনোসাইড স্টাডিজের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটন, মালয়েশিয়ার মালয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রাজাহ রাইসা, কোস্টারিকার ইউনিভার্সিটি ফর পিসের রেক্টর ফ্রান্সিস্কো রোজা অ্যারাভিনা, ইন্দোনেশিয়ার সোসাইটি এগেইনস্ট র‌্যাডিকালিজম অ্যান্ড ভায়োলেন্ট এপট্রিমিজমের প্রতিষ্ঠাতা সিতি দারোজাতুল আলিয়া এবং চীনের তিসুংগুয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া বিভাগের পরিচালক ড. লি লি।

অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটন বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে গণহত্যা বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়া। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ১৯৪৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আর ১০ কোটির বেশী মানুষ নিহত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ের গণহত্যায়। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে সভ্যতার এত উৎকর্ষতার পরও যুদ্ধ, গণহত্যা কোনটিই বন্ধ হয়নি। বরং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুদ্ধ পরিচালনার মত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেখানে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নানা ইস্যুতে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়ই ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ব নেতৃত্বের এ ধরনের অবস্থার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কম। গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতেই হবে।

অধ্যাপক রাজাহ রাইসা বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিশ্ব ব্যবস্থায় মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী কাছাকাছি, আবার একাকিত্বও বাড়ছে। এখন বড় সুযোগ আছে তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যবহার করে সমাজে অশান্তি সৃস্টির উপাদানগুলো সম্পর্কে সচেতন করে তোলার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার।

কোস্টারিকার ফ্রান্সিস্কো রোজা অ্যারাভিনা বলেন, বিশ্বে সেদিনই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে যেদিন প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা আর ঘটবে না। তিনি বলেন, সভ্যতার একটা পর্যায়ে এসেও যখন প্রতিহিংসা প্রকাশ হিসেবে শারীরিক নির্যাতন চলে দেশে দেশে, তখন সেই মানব সভ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।