এলমা চৌধুরী মেঘলা। নামের মতো তার সংসারের আকাশেও জমেছিল মেঘ! সেই মেঘ চোখ ভিজিয়ে অশ্রু হয়ে ঝরেছিল দিনের পর দিন। জমাটবদ্ধ বেদনা বুকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল শত। লড়তে লড়তে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যান। তবে কষ্ট বুকে নিয়ে জীবন হারানো এলমার মৃত্যু এখনও রহস্যঘেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নৃত্যকলা বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী এলমার সঙ্গে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন থেকে শুরু করে কী বাদ রেখেছেন স্বামী ইফতেখার আবেদীন শাওন?
'আমি বাজে মেয়ে। আমার চরিত্র ভালো ছিল না। বিয়ের পর স্বামীর পরামর্শে সুপথে ফেরার চেষ্টা করছি-' এমন লেখা দিনে ১০০ বার লেখাতেন স্বামী শাওন। প্রতিদিন এটাই যেন ছিল তার হোমওয়ার্ক (বাড়ির কাজ)। এমনকি বাইরের কারও সঙ্গে মেলামেশাও নিষিদ্ধ ছিল এলমার। কারও সঙ্গে সুন্দর কণ্ঠে কথা বলাও ছিল বারণ। ঢাবির পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয় বারংবার। এ ছাড়া বাবা-চাচার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও বোরকা ও হিজাব পরার আদেশ জারি করেন শাওন। স্বামীর এমন অদ্ভুতুড়ে আচরণ সহ্য করেও এলমা তার সংসার টেকানোর যুদ্ধে ছিলেন। শেষ অবধি পারেননি। এলমার মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় দ্বিতীয় দফায় গত বুধবার পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয় শাওনকে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনি স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেননি। শুধু এলমাকে শারীরিক নির্যাতনের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন।
এলমার মা শিল্পী চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'কী ধরনের পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে এলমা সংসার করে যাচ্ছিল, এটা বোঝানো কঠিন। জামাই শুরু থেকেই এলমাকে সন্দেহ করে আসছিল। বিয়ের পর দুই মাস দেশে থাকার পর কানাডায় চলে যায় শাওন। সেখান বসে ২৪ ঘণ্টা ভিডিও কলে এলমাকে নজরদারিতে রাখত। এক মুহূর্তের জন্য নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলে পরিবারের অন্যদের ফোন দিয়ে এলমার অবস্থান জানতে চাইত।'
এলমার মা আরও বলেন, 'বিয়ের পর মেয়েকে দেখতে একবার বনানীর বাসাই যাই। গিয়ে দেখি, ওর বিছানার ওপর একটি খাতায় অদ্ভুত সব বিষয় লেখা। সেখানে লেখা ছিল- এলমা খারাপ চরিত্রের মেয়ে। এখন ধীরে ধীরে এলমা ভালো পথে আসছে। লেখাগুলো দেখে এলমার কাছে এ সবকিছুর কারণ জানতে চাই। তখন সে বলেছিল, এসব জামাইয়ের পাগলামি।'
এলমার মা বলেন, 'মেয়েকে এটাও বলেছিলাম, স্বামী বললেই তুমি কেন নিজের সম্পর্কে এমন কথা লিখতে যাবে? তখন মেয়ে বলেছিল, এসব না লিখলে তার ওপর আরও মানসিক নির্যাতন চালায় শাওন। এসব শুনে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসতে বলেছিলাম। এলমা জানিয়েছিল, কানাডা থেকে শাওন ফিরলে চূড়ান্ত কথা হবে। তবে শাওন কানাডা থেকে ফেরার পর আমার মেয়ের জীবন দিতে হলো। এলমার ফোন পরীক্ষা করে দেখলে নির্যাতন ও শাওনের কুরুচিপূর্ণ কাজের অনেক আলামত পাওয়া যাবে।'
এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, 'মৃত্যুর আগের দিন রাতে এলমার শাশুড়ি ফোন করে বলছিলেন- এলমা বাসায় ঝগড়া ও চিৎকার করে কান্নাকাটি করছে। তখন আমরা ওদের বলেছি, আমার মেয়েকে বন্দি করে রাখছেন। মানুষ হিসেবে ওর কোনো স্বাধীনতা নেই। মেয়েকে তার মতো স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিন।'
এলমার পরিবার ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরেই এলমার সঙ্গে গত ২ এপ্রিল কানাডা প্রবাসী শাওনের বিয়ে হয়। এর আগে ২০০৫ সালে ফ্রান্সের এক তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন শাওন। ২০১৭ সালে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়। ওই ঘরে শাওনের ১১ বছরের একটি মেয়ে আছে। সে বর্তমানে তার মায়ের সঙ্গে ফ্রান্সে আছে। গত মার্চে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাবি ছাত্রী এলমার সঙ্গে পরিচয় শাওনের। এর পর তারা পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। শাওনের মায়ের প্রথম বিয়ে ভাঙার পর সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে বিয়ে করেন তিনি। ঢাকায় এলে শাওন সেখানে উঠতেন। এলমাও সেই বাসায় বাস করতেন।
শাওনের ভাষ্য :পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শাওন দাবি করেন, ১৩ ডিসেম্বর রাতে এলমার সঙ্গে তার প্রথমে ঝগড়া, পরে হাতাহাতি ও মারামারি হয়। ওই রাতে শাওন দীর্ঘ সময় ভিডিও কলে বিদেশে অবস্থানরত এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলেন। এটা দেখে এলমার সন্দেহ হয়। মোবাইল ফোন নিয়ে কার সঙ্গে শাওন কথা বলছিলেন- এটা দেখতে চান। তবে শাওন তার ফোন দেখাতে রাজি হননি। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে এলমাকে মারধর করা হয়। শাওনের দাবি- এলমাও তাকে আহত করেছে। তবে শাওনের শরীরে গুরুতর আঘাতের তেমন কোনো চিহ্ন নেই।
শাওনের ভাষ্য, এ ঘটনার জন্য ওই দিন ভোরে এলমার কাছে ক্ষমা চান তিনি। এর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। পরদিন তারা একসঙ্গে সকালের নাশতা করেন। তবে দুপুরে শাওন তার স্ত্রীকে বলছিলেন, ২৭ বা ২৮ ডিসেম্বর কানাডা ফিরে যাবেন। তখন এটা নিয়ে আবার তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। শাওনের দাবি, ঝগড়ার এক পর্যায়ে ওই দিন দুপুরেই এলমা তার কক্ষে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। কয়েক ঘণ্টা পরও তার সাড়া না পেয়ে গৃহকর্মী, গাড়িচালক ও বাসার অন্য লোকজন দরজা ভেঙে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান, আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। এলমা আত্মহত্যা করেছেন- এমনটা গতকাল পর্যন্ত শাওন দাবি করলেও তদন্তসংশ্নিষ্টরা বলছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্য আলামতের যথার্য বিশ্নেষণ ছাড়া এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। শাওনের বক্তব্যে নানা গরমিল রয়েছে।
বনানী থানার ওসি নূরে আজম মিয়া বলেন, এলমার ফোন এখনও পাওয়া যায়নি। এ মামলায় তার শ্বশুর-শাশুড়ি পলাতক। তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে হয়তো ফোনের খোঁজ মিলবে। শাওনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তামান্না রহমান বলেন, 'করোনা সংকটের পর গত অক্টোবরে পরীক্ষা দিতে এলমা ক্যাম্পাসে দু'দিন এসেছিল। বোরকা ও হিজাব দেখে আমরা তো অবাক। সে সময় এক ব্যক্তি সার্বক্ষণিক তাকে পাহারা দিয়ে রাখছিল। পুরো সময় স্বামী ভিডিও কলে এলমার সঙ্গে ছিল।'
গত ১৪ ডিসেম্বর এলমাকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেন শ্বশুরপক্ষের লোকজন। পরিবারের লোকজন দাবি করেছেন, সন্দেহের বশে তাকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন নির্যাতন করে হত্যা করেছে। পুলিশের সুরতহালে বেরিয়ে আসে শরীরে আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন।




বিষয় : আমি বাজে মেয়ে এলমা চৌধুরী মেঘলা

মন্তব্য করুন