রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান কার্যালয় থেকে প্লটের ৭০টি ফাইল সরিয়ে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগে স্বর্ণ চোরাকারবারি কথিত ব্যবসায়ী অটো কার সিলেকশনের মালিক মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মঙ্গলবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় রাঙ্গামাটির উপপরিচালক মো. শফি উল্লাহ বাদি হয়ে কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলাটি দায়ের করেন। 

মামলার অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় ও গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মামলাটি অনুমোদনের সময় এই কর্মকর্তা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তাকে রাঙ্গামাটি কর্যালয়ে বদলি করা হয়। গতকাল তিনি রাঙ্গামাটি কার্যালয় থেকে ঢাকায় ঢাকায় এসে মামলাটি করেন।

এজাহারে বলা হয়, গোল্ডেন মনির জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পের ৭০টি প্লট আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন। এ লক্ষ্যে রাজউকের প্রধান কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে ৭০টি ফাইল প্রধান কার্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল রাজউক এনেক্স ভবনের ৫১৪ কক্ষে। 

এই কক্ষে বসেই জাল কাগজপত্র তৈরি করে প্লটগুলো আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়।

তার ওই পরিকল্পনার কথা জেনে গিয়েছিলেন রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. সুলতান আহমেদ। এরপর গত ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর তার নেতৃত্বে ম্যাজিস্ট্রেট জেসমিন আক্তারের উপস্থিতিতে আট সদস্যের একটি বিশেষ টিম রাজউক এনেক্স ভবনের পঞ্চম তলার ৫১৪ নম্বর কক্ষে তল্লাশি চালায়। তল্লাশিকালে ওই আবাসিক প্রকল্পের ৭০টি প্লটের ফাইল, একটি ল্যাপটপ, রাজউক কর্মকর্তাদের নামে ১৫টি সিল, স্ট্যাম্প প্যাড, ঢাকা সিটি করপোরেশনের ১৭০টি প্রত্যয়নপত্র, একটি ডিমান্ড কালেকশন রেজিস্ট্রার (ডিসিআর) বই, চারটি লিজ ডিডের কপি, বরাদ্দপত্রের কপিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। 

ওইদিন মতিঝিল থানা পুলিশের মাধ্যমে ওইসব আলামত জব্দ করা হয়।

তল্লাশি ও ওইসব আলামত জব্দ করে জালিয়াতি করে প্লট আত্মসাতের পরিকল্পনা ঠেকানো হয়। 

এরপর গত ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর স্বর্ণ চোরাচালান, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বেআইনীভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা, প্রতারনা, জালিয়াতির অভিযোগে গোল্ডেন মনিরকে রাজধানীর বাড্ডায় তার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

এজাহারে আরও বলা হয়, এনেক্স ভবনের ওই কক্ষে তল্লাশির সময় গোল্ডেন মনিরের কর্মচারী মো. নাসির ও রাজউকের পিয়ন মো. পারভেজ চৌধুরীকে ফাইলগুলো নিয়ে কাজ করতে দেখা গিয়েছিল। পরে নাসির পালিয়ে যায়। ওই সময় পারভেজকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। 

প্লট জালিয়াতির কাজকর্ম করতে রাজউক এনেক্স ভবনের ৫১৪ নম্বর কক্ষটি ১৯৮৬ সাল হতে পলি ওভারসীজের মালিক ফজলুল হকের নামে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।

ফজলুল হক কক্ষটির তিন ভাগের এক ভাগ জনৈক মনির হোসেনকে সাবলেট হিসেবে ভাড়া প্রদান করেন। 

প্লটের ৭০টি ফাইল গোল্ডেন মনিরের নির্দেশে রেকর্ডরুম ও সংশ্নিষ্ট শাখা থেকে সংগ্রহ করে ওই ভবনের ৫১৪ নম্বর কক্ষে নেওয়ঙা হয়েছিল। জাল কাগজপত্র তৈরি করে প্লটগুলো আত্মসাৎ করতে কাজ শুরু করেছিলেন গোল্ডেন মনির। এর সঙ্গে উজউকের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও জড়িত।

ওই ৭০টি ফাইল সরিয়ে নিয়ে সরকারি প্লট আত্মসাতের ষড়যন্ত্রে আরও আটজনের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। তাদেরও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন, রাজউক উপপরিচালক মো. দিদারুল আলম, সাবেক সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. নাসির উদ্দিন শরীফ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. আনোয়ার হোসেন, উর্ধ্বতন হিসাব সহকারী (নিরীক্ষা ও বাজেট শাখা) এসএম তৌহিদুল ইসলাম, কার্য তদারককারী (মান-২, এস্টেট ও ভূমি-১) মো. আলাউদ্দিন সরকার, পিয়ন মো. পারভেজ চৌধুরী, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও নারায়নগঞ্জের ফতুল্লার মো. নাসির উদ্দিন খান।

এজাহারে বলা হয়, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজে অবৈধভাবে লাভবান হওয়া ও অন্যকে লাভবান হতে সহায়তার উদ্দেশ্যে গত ২০১৭ সাল থেকে ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ওইসব ফাইল সরিয়ে ফেলেন।

অফিসিয়ালি নথি মুভমেন্ট রেজিস্ট্রারে না পাঠিয়ে সরকারি নথিপত্র কৌশলে সরিয়ে ও বিভিন্ন কর্মকর্তার সিল তৈরি করে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে বেআইনিভাবে ভুয়া নথি সৃজন ও লীজ দলিল সম্পাদক করে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা চেষ্টা করে আসামিরা দন্ডবিধির ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪০৯/৫১১/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।