ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধিকাংশ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট হালনাগাদ করা হয়নি। এছাড়াও ডিএনসিসির মোট গাড়ির বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চালক নেই এবং অধিকাংশ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স হালনাগাদ করা হয়নি। 

ডিএনসিসির পরিবহন, যান্ত্রিক সার্কেল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রদত্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এমন তথ্যই পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

গত ২৫ নভেম্বর রাজধানীর পান্থপথে ডিএনসিসির বর্জ্যবাহী ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় সাংবাদিক আহসান কবির খান নিহত হওয়া ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছিল ডিএনসিসি। সেই কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ডিএনসিসির এই তদন্ত কমিটির দায়িত্বে ছিলেন প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর এস এম শরিফ-উল ইসলাম। 

কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আবুল হাসনাত মো. আশরাফুল আলম ও মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) মো. মিজানুর রহমান।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গাড়ি চালকদের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নাই। 

এতে আরও বলা হয়েছে, বর্জ্যবাহী গাড়িতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়োজিত হেলপার বা সেকেন্ড সিটার নাই। 

তাছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী গাড়িগুলো বেশিরভাগ সময় দিনের বেলা বর্জ্য পরিবহন করে থাকে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিয়মিত ড্রাইভার বিশেষত ভারী গাড়ি চালকের স্বল্পতার কারণে ড্রাইভার ছাড়াও শ্রমিককর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী বিভিন্ন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি চালাচ্ছেন। 

আহসান কবির খানের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পষ্ট সিসি ক্যামেরা ফুটেজ কিংবা দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় ঘটনাটি সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। 

এতে বলা হয়, পারিপার্শ্বিক এবং নিহতের পরিবারের সাথে আলোচনা করা জানা গেছে, আহসান কবির রাইড শেয়ারিং অবস্থায় ছিলেন। তবে দুর্ঘটনার পর চালকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে মোটরসাইকেল চালকের সন্ধান জরুরি বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, আহসান কবিরকে চাপা দেওয়া বর্জ্যবাহী সেই ট্রাকটির  রেজিষ্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল না। তবে চালক মো: হানিফ ওরফে ফটিকের হালকা গাড়ি চালানোর বৈধ লাইসেন্স ছিল। 

গত ডিসেম্বরে রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান নটরডেম কলেজের ছাত্র নাঈম।  আহসান কবির খানের মৃত্যুর সপ্তাহ না পেরোতেই রাজধানীর শ্যামলীতে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক এমদাদ হোসেন।

এরপর রাজধানীজুড়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে দাপিয়ে বেড়ানো ময়লার ট্রাকের ফিটনেস, গাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকদের বিষয়ে দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতি নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয় দেশজুড়ে।

সেই সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তদন্ত কমিটি বেশকয়েকটি সুপারিশ দিয়েছে।

সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে

#সড়ক নিরাপত্তা আইন এবং নিরাপদ গাড়ি চালানোর বিষয়ে ড্রাইভারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

#চালকদের হালনাগাদ লাইসেন্স থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারে। হালকা লাইসেন্সধারীদের দিয়ে ভারী গাড়ী চালানো নিষিদ্ধ করাসহ গাড়িগুলোর রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

#ডিএনসিসির শূন্য পদের বিপরীতে দ্রুত নতুন গাড়ি চালক নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি গাড়ির সংখ্যানুপাতে নতুন গাড়ি চালকের পদ সৃজন করে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। 

#ভারী গাড়ীতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলপারসহ কমপক্ষে ভারী গাড়ীতে লাইসেন্সধারী সেকেন্ড সিটার রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। 

#ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সব গাড়িতে ড্যাশবোর্ড ক্যামেরা এবং ভিটিএসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

#সব গাড়ি ও চালকদের একটি বিভাগ (পরিবহন পুল) এর মাধ্যমে পরিচালনা করাসহ গাড়ি চালকদের অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে এবং বর্জ্যবাহী গাড়ি সন্ধ্যার পর থেকে সকাল ৭ টা পর্যন্ত চালানো যেতে পারে।

এছাড়া প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, হালকা গাড়ির লাইসেন্স নিয়ে ভারী গাড়ি চালানোর কারনে চালক মো: হানিফ (ফটিক) কে দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি আহসান কবিরকে বহন করা সেই মোটরসাইকেল চালককেও বেপরোয়া গতির কারণে দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। 

ডিএনসিসি জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় পুলের ৪৪টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন হালনাগাদ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে পাওয়া ৫৬টি বর্জ্যবাহী গাড়ির রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ডিএনসিসির নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করতে মেয়র আতিকুল ইসলাম নির্দেশ দিয়েছেন।

ডিএনসিসির হালকা লাইসেন্সধারী চালকদের ভারী লাইসেন্স দিতে বিআরটিসির মাধ্যমে প্রশিক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে খুব শীঘ্রই প্রশিক্ষণ শুরু হবে।