শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবরুদ্ধ উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে উদ্ধার করেছে। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং নাম জানা যায়নি।

রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে তালা ভেঙে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উপাচার্যকে উদ্ধার করে তার বাসভবনে পৌঁছে দেয় পুলিশ সদস্যরা। আহত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল এবং জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানা গেছে।

অবরুদ্ধ উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ- ছবি- ইউসুফ আলী।

আহত শিক্ষার্থীরা হলেন- ইংরেজি বিভাগের তানহা তাহসীন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের মিত্রা সংঘ ও সজল কুন্ডু। আর বিভাগের নাম পাওয়া যায়নি এমন আহত শিক্ষার্থীরা হলেন, মেহজাবিন পর্ণা, সাজেদুল ইসলাম সিজন, তাকিয়া ইসলাম, জুনায়েদ ইসলাম, সাজ্জাদ হোসেন, মসিউর ইসলাম, ইরফান, রায়হান আহমেদ, মুনির হোসেন তালুকদার, সেলিম, তমাল, সিফাত আকাশ, জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব, হুমায়ূন কবির অপূর্ব। বাকি শিক্ষার্থীদের নাম জানা যায়নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম এবং ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক জহীর উদ্দীন আহমদও আহত হয়েছেন। 

জানা যায়, বিকেল ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনে অবরুদ্ধ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এরপর শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। এসময় শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে একটু পিছু হটে ইট পাটকেল ছুড়তে থাকেন। পুলিশের লাঠিচার্জে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এর এক পর্যায়ে ২৫-৩০টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলির শব্দ শোনা যায়। এসময় পুলিশের গুলিতে এক নারী পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলেও জানা যায়। পরে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে তালা ভেঙে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উপাচার্যকে  উদ্ধার করে তার বাসভবনে পৌঁছে দেয় পুলিশ সদস্যরা। ঘটনার পরে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার পর ক্যাম্পাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এই ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আলমগীর কবির বলেন, আমাদের অনেক শিক্ষক, ভিসি দপ্তরের কর্মকর্তা এবং পুলিশসহ অনেকেই আহত হয়েছেন। আমি সবার খোঁজ খবর না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।

উপাচার্যকে উদ্ধারের সময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ উত্তরের ডেপুটি কমিশনার আজবাহার আলী শেখ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষার্থীরা পুলিশের উপর উত্তেজিত হয়। এরপরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

এর আগে শিক্ষার্থীরা ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী ছাত্রী হলের প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগের দাবিসহ তিন দফা দাবি আদায় এবং ছাত্রীদের চলমান আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগে রোববার সকাল থেকে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। পরে দুপুর পৌনে ৩টার দিকে গোল চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আলমগীর কবির, ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক জহীর উদ্দীন আহমদ, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মহিবুল আলম।

এক পর্যায়ে ২৫-৩০টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলির শব্দ শোনা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক সমিতির সভাপতি শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন হলের গুণগত মান উন্নত এবং অব্যবস্থাপনার সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্য তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে সাত দিনের সময় চান। কিন্তু শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি না মানার পরিপ্রেক্ষিতে তারা বর্ধিত সময় দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন এবং তখন শিক্ষার্থীরা তাদের সামনেই ‘ধিক্কার ধিক্কার, প্রশাসন ধিক্কার’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।

এরপরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পিছু নেন এবং অর্জুন তলা থেকে ফিরে রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে গেলে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনকে সামনে পান। তখন শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পিছু নিয়ে ‘ধিক্কার ধিক্কার’ স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় উপাচার্যকে নিয়ে উপস্থিত শিক্ষক ও কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনে ঢুকলে শিক্ষার্থীরা সেখানে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন।

প্রসঙ্গত, ছাত্রী হলে শিক্ষার্থীরা সমস্যা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে পানি, সিট, ইন্টারনেট, খাবারসহ বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা হলের রিডিং রুমে আলোচনা করেন। ওই সময় তাদের সমস্যার কথাগুলো বলতে প্রভোস্টকে হলে আসার অনুরোধ জানান তারা। তখন প্রভোস্ট জাফরিন আহমেদ লিজা অসুস্থতার কথা জানালে ছাত্রীরা প্রভোস্ট বডির একজন সদস্যকে অল্প সময়ের জন্য হলে আসার অনুরোধ জানান এবং বিষয়টি জরুরি বলে উল্লেখ করলে প্রভোস্ট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। 

এরপরে শিক্ষার্থীরা প্রভোস্টের আচরণে হল থেকে বের হয়ে বৃহস্পতিবার রাত ২টা পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলন করেন। পরে উপাচার্যের আশ্বাসে রুমে ফিরেন শিক্ষার্থীরা। পরদিন শুক্রবার উপাচার্যের আশ্বাস অনুযায়ী উপাচার্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদল আলোচনায় বসেন। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শুক্রবার আন্দোলন চালিয়ে যান এবং আল্টিমেটাম দেন।