টাঙ্গাইলের মধুপুর বন বিভাগের মহিষমারা বিটের বনভূমি দখল ও সামাজিক বনায়নের গাছ চুরি চলছে নির্বিঘ্নে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বন এলাকার ১০ কিলিমিটারের মধ্যে স’ মিল স্থাপনের বিধান না থাকলেও বন বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজসে অনুমোদনহীনভাবে চলছে স’ মিল। এসব মিলে দিনরাত চলছে বনের কাঠ চেরাইয়ের কাজ।

সাতশ’ একর বনভূমি দখলে

মধুপুর রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মহিষমারা ও চাড়ালজানি বিট মিলে মধুপুর রেঞ্জ। এই রেঞ্জের মহিষমারা বিটের ৭শ'৫৬ দশমিক ১২ একর বনভূমি ১২শ' ১৩ জন অবৈধ দখলকারী দখল করে আছে এবং চাড়ালজানি বিটে ২ হাজার ৩শ' ৭৩ দশমিক ৬২ একর বনভূমি ১ হাজার ৫৩৭ জন অবৈধভাবে দখল করে আছে। ইতিমধ্যে ১শ' ৩ দশমিক ৯০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হলেও বাকি ৩ হাজার ২৫ দশমিক ৮৪ একর বনভূমি রয়েছে দখলে।

মোটের বাজারের সাইফুল ইসলাম, মহিষমারার আমজাদসহ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আউশনারা ইউনিয়নের কলেজপাড়া ও হাজীপাড়া এলাকার খোরশেদ আলম, জমসের ও মর্তুজ আলীর প্লট থেকে মোটেরবাজারের ওমর ফারুক গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার সময় ঘোড়াগাড়িসহ স্থানীয়রা আটক করে। পরে বন বিভাগের লোক এসে গাছগুলো জব্দ করে নিয়ে যায়। এভাবে শুধু খোরশেদ, জমসের মর্তূজ আলীর গাছই নয়, বন বিভাগের বিভিন্ন অংশের গাছ কেটে নেয়া হয়।

অবাধে গাছ চুরি 

প্রশাসনের তৎপরতা না থাকায় দমানো যাচ্ছে না গাছ চোরাকারবারীদের। এতে দেখা দিয়েছে বন্যপ্রাণীদের খাদ্য সঙ্কট, ঐতিহ্য হারাচ্ছে মধুপুর গড়ের শালবন। ভূমি দখলে মেতে উঠেছে স্থানীয় ভূমিখেকোরা। সামাজিক বনায়নে চাষ করা হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে আনারস, আদা, হলুদ ও কলাসহ নানা কৃষি ফসল। 

মধুপুরের মহিষমারা বিট ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী বিট থাকায় স্থানীয় ও পাশের জেলার সংঘবদ্ধ গাছ চোররা মেতে উঠেছে গাছ চুরিতে। ফলে বঞ্চিত হচ্ছে বনায়নের অংশীদাররা। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।

হাজীপাড়া এলাকার খোরশেদ আলম জানান, ওমর ফারুক মহিষমারা বিটের বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে থেকেও অবাধে গাছ কেটে সামাজিক বনায়ন উজাড় করায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মহিষমারা বিটের বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অংশীদার খোরশেদ আলম আসবাবপত্র বানানোর জন্য আমার কাছে গাছ চেয়েছিল বলে গাছ কাটা হয়েছে। গাছ চাইলেই আপনি সরকারি গাছ কাটতে পারেন কিনা? এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি।

তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকায় তার বিরুদ্ধে স্থানীয়রা মুখ খুলতে সাহস পায় না। তার বিরুদ্ধে বন আইনে একাধিক মামলাও রয়েছে।

বন বিভাগের জমিতে মাটি ভরাট 

বনভূমিতে গিয়ে দেখা যায়, মোটের বাজারের ছামান আলী নামে এক ব্যক্তি বন বিভাগের জমি কার্টিজ মূলে কিনে মাটি ভরাট করছে। শুধু ছামান আলী নয় প্রভাবশালী অনেকেই বন বিভাগের জমি এভাবে দখল করে নিয়েছে।

মহিষমারা হামের বাজারের মহর আলী জানান, তার সামাজিক বনায়নের প্লট থেকে সম্প্রতি গাছ চুরি হয়। স্থানীয় সিএফডব্লিউ শামছুল হক এ গাছ কেটে নিয়েছে। শামছুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, গাছগুলো সামাজিক বনায়নের নয়।

মহিষমারা বিট কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম জানান, আমি নতুন এসেছি। খবর পেয়ে প্লটে গিয়েছিলাম। এ ব্যাপারে মামলা করা হবে।

সদ্য বিদায়ী মহিষমারা বিট কর্মকর্তা আওলাদ হোসেন জানান, মোটের বাজার এলাকার গাছ চুরির ঘটনায় ওমর ফারুকের নামে মামলা হয়েছে। এখন সিএফডব্লিউ’রা তাদের সহযোগিতা করে।

মধুপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা আমিনুর রহমান জানান, মহিষমারা বিটে ৭৫৬.১২ একর ১ হাজার ২১৩ জন এবং চাড়ালজানি বিটে ২ হাজার ৩৭৩.৬২ একর বনভূমি ১ হাজার ৫৩৭ জন ব্যক্তি অবৈধভাবে দখল করে আছে। এর মধ্যে ১০৩.৯০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অবৈধ দখল থেকে বনভূমি উদ্ধার করে বনায়ন করা হবে। 

তিনি জানান, যারা দখল করে আছে প্রয়োজনে তাদের সামাজিক বনায়নে অংশীদার করা হবে।