রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্র খালটি বছিলা হয়ে আদি বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মিশে ছিল। আশপাশের বৃষ্টির পানি ওই খালের মাধ্যমেই নিস্কাশিত হতো। কিন্তু খালটির বছিলার লাউতলা থেকে প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ এলাকা প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। খালের ওই অংশ লাউতলা খাল হিসেবেই পরিচিত। স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী লাউতলা খালটি ভরাট করে গড়ে তুলেছিলেন বাড়ি, ট্রাকস্ট্যান্ড, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা। অবশেষে গত রোববার খালটি উদ্ধার শুরু করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রথম দিনেই গুঁড়িয়ে দেয় বেশ কয়েকটি ভবনসহ অবৈধ স্থাপনা। বর্তমানে চলছে খালটি খননের কাজ। এক্সক্যাভেটর দিয়ে প্রতিদিনই খননকাজ চলছে। ইতোমধ্যে ভরাট হওয়া খালটি পুরোনো চেহারায় ফিরতে শুরু করেছে।

বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, তিনটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে মাটি খননের কাজ। আর ডাম্প ট্রাক দিয়ে অপসারণ করা হচ্ছে সেই মাটি। শ্রমিকরা নির্মাণাধীন একটি অবৈধ বহুতল ভবন অপসারণ করছেন। রোববার থেকে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম প্রায় প্রতিদিনই সেখানে উপস্থিত থাকছেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামও পরিদর্শন করেন।

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম জানান, ডিএনসিসির কাছে খালগুলো হন্তান্তরের আগে খালের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অবহেলার কারণেই খালটি দখল-দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। খালটি যাতে উদ্ধার না করি, এ জন্য অনেক প্রভাবশালীর কাছে থেকে চাপ এসেছে। সেই চাপে তিনি নত হননি। নগরবাসীকে জলজট ও জলাবদ্ধতার কবল থেকে মুক্ত করতে হলে যে কোনো মূল্যে খালগুলো উদ্ধার করতে হবে। খালটিকে উদ্ধার করে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। তাহলে ওই এলাকায় আর জলাবদ্ধতা হবে না। উদ্ধার অভিযানের পর খালটি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম এমপি বলেন, রাজধানীর খালগুলো উদ্ধার করে দৃষ্টিনন্দনভাবে সজ্জিত করলে মানুষকে আর ভেনিস শহর দেখতে যেতে হবে না। ঢাকা শহরই ভেনিসের আঙ্গিকে পরিণত হবে।

ডিএনসিসি জানায়, গত কদিনের অভিযানে একটি বহুতল ভবনের সম্পূর্ণ অংশ ও তিনটি ভবনের আংশিক ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া একটি কাঁচাবাজারের অবকাঠামোসহ অর্ধশত দোকান অপসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে চলছে মূল খালটি খননের কার্যক্রম।
ডিএনসিসির একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, একটি ভরাট হওয়া খালকে নিজস্ব চেহারায় ফিরিয়ে আনতে সময়ের প্রয়োজন। আর মেয়র চাচ্ছেন খালটিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে খনন করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে। কাজেই এ জন্য বেশ সময়ের প্রয়োজন। পানিপ্রবাহ সৃষ্টি না করা পর্যন্ত প্রতিদিনই এখন খননকাজ চলবে।

স্থানীয়রা জানান, রামচন্দ্রপুর খালটির শুরু বুড়িগঙ্গা নদীতীরের চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকা থেকে। এরপর মোহাম্মদপুরের বছিলা, চাঁদ উদ্যান হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ ঘুরে খালটি বাড়ইখালী এলাকা দিয়ে আবার বুড়িগঙ্গাতেই মিশেছে। তবে মাঝে বছিলার লাউতলা বাজার এলাকায় খালের প্রায় ২০০ মিটার ভরাট করে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। টার্মিনাল-দোকান-বাজার বানিয়ে অসাধু চক্রটি প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করত। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে ওই এলাকার পানি নদীতে যেতে পারত না। ফলে সামান্য বৃষ্টিপাতেই সৃষ্টি হতো জলাবদ্ধতা।

স্থানীয় বাসিন্দা শহিদ আলম বলেন, বেড়িবাঁধ থেকে খালের আরেকটি শাখা লাউতলা খালে মিশেছিল। সেই অংশও ভরাট হয়ে গেছে। ওই অংশের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করে খালে পরিণত করা হলে এলাকায় আর জলাবদ্ধতা হবে না।

স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, মমতাজ মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবনেরও কিছু অংশ খালের ভেতরে পড়েছিল। সেগুলো এখন টাকা খরচ করে সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ করছে। শুরুতেই এসব ভবন নির্মাণ বন্ধ করলে এই অর্থ খরচ করতে হতো না।

স্থানীয়রা জানান, ক্যাসিনোকাণ্ডে আটককৃত স্থানীয় কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবসহ সরকারদলীয় কিছু লোক তিন-চার বছর আগে লাউতলা বাজার এলাকায় খালে মাটি-বর্জ্য ফেলে ভরাট করেন। যে অংশে টার্মিনাল করা হয়েছিল, সেখানে খালের প্রশস্ততা ছিল প্রায় ১০০ মিটার। খালপাড়ের বাড়ির মালিকরাও কিছু জায়গা দখল করেছিলেন। ফলে পানি আর প্রবাহিত হতো পারছিল না।