সমাজে অসহায় পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করে অনেককে বাঁচতে হয়। অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়; হতে হয় নির্ভরশীল। জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলে সহযোগিতা পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি করতে হয়। জীবনের এরূপ ধরন কখনও কাম্য নয়। তবে সমাজে বৈষম্যের প্রতিলিপি দীর্ঘায়িত হলে কিংবা মানুষের অবস্থার পরিবর্তনে সমচিন্তা ও কর্মসূচি প্রণয়ন অসম্ভব হলে সনাতন পদ্ধতির ওপর সর্বস্ব হারানো মানুষকে নির্ভর করতে হয়। অতীত সামাজিক অভিজ্ঞতায় লক্ষণীয়, বাংলাদেশে শহর ও গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট উপার্জনের জন্য স্থায়ী কর্মের সুযোগ না থাকা; পরিবারের সদস্যদের প্রতি অবহেলা ও উদাসীন আচরণ; দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং অর্থোপার্জনের জন্য নিজস্ব অনুকূল ও উপকরণ না থাকা মানুষ সহজ উপায় হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়। প্রায় সমজাতীয় একটি বেশ ধারণ করে এবং নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে মানুষের কাছে হাত বাড়িয়ে দেয়।

ঢাকা শহরে ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে গল্পের শেষ নেই। যারা ভিক্ষা করছে তারা সবাই অসহায়- বিষয়টি এমন নয়। সংঘবদ্ধ চক্রের চাপে ভিক্ষাবৃত্তির ধরনে পরিবর্তন এসেছে এবং ভিক্ষুকের সাহায্য-বক্তব্যের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও ভিন্নতায় পরিগ্রহ হচ্ছে। এরূপ উদ্দেশ্য সামনে রেখে ভিক্ষাবৃত্তির বর্তমান পরিস্থিতি ও উত্তরণের উপায় সম্পর্কে ঢাকা শহরভিত্তিক গবেষণা কর্মটি সম্পাদিত হয়। উদ্দেশ্যমূলক কৌশল অনুসরণে মোট ৪০ জন ভিক্ষুক উত্তরদাতা হিসেবে বাছাই করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাদের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ, ১০ জন নারী। আলোচ্য গবেষণার ফলাফলে লক্ষণীয়, ৫৭-৬৭ বছর বয়স বন্ধনীর মধ্যে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেশি, যা শতকরা হিসাবে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যুবক এবং অতি প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তির হার সবচেয়ে কম। যুবকদের মধ্যে ২ দশমিক ৫ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে অতি প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যেও এই হার একই রকম। ঢাকা শহরে মোট ২৯টি স্থান থেকে ভিক্ষুকরা সমবেত হয়, যা আলোচ্য গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল (৪০ শতাংশ) এবং টাঙ্গাইলের (৭ দশমিক ৫ শতাংশ) হার বেশি। অর্থাৎ এ দুটি স্থান থেকে নানা কারণে জীবনের অসহায়ত্বের চাপে অথবা অন্য কোনো কারণে মানুষ ঢাকায় এসে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িত হচ্ছে।

ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে দৃশ্যমান, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভিক্ষুুকের সন্তান ও আত্মীয়-পরিজন সহযোগিতা করে না। ৪০ শতাংশ ভিক্ষুককে দেখার মতো কেউ নেই। ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ভিক্ষুকের সন্তান রয়েছে, তবে কর্ম নেই এবং ৫ শতাংশ ভিক্ষুকের সন্তানরা বিয়ে করে আলাদা থাকে। প্রতিদিন ভিক্ষা করে ৪৫ শতাংশ ভিক্ষুক ৩০০ টাকা, ৩০ শতাংশ ৪০০ টাকা, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ২০০ টাকা উপার্জন করে এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশের আয়ের নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। অর্থাৎ যখন যা আয় হয়। লক্ষণীয়, ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ সপ্তাহে ছয় দিন, ৩৫ শতাংশ প্রতিদিন, ২৫ শতাংশ চার দিন এবং ২ দশমিক ৩ শতাংশ তিন দিন ভিক্ষা করে। উল্লেখ্য, ৫৫ শতাংশ ভিক্ষুক সকালে, ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ দুপুরে ও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সন্ধ্যা বা রাতে ভিক্ষা করে।

সম্পাদিত গবেষণায় ভিক্ষুকদের প্রতি জনগণের মনোভাব-সংশ্নিষ্ট প্রশ্নে ভিক্ষুকরা মতামত দেয়, মাত্র ৫ শতাংশ ভিক্ষুকের ভিক্ষাবৃত্তি জনগণ 'ভালো' হিসেবে বিবেচনা করে। ১২ দশমিক ৫ শতাংশ 'খারাপ' হিসেবে মূল্যায়ন করে এবং ৮২ দশমিক ৫ শতাংশের মতামতে 'উভয় মন্তব্য' বিদ্যমান। অর্থাৎ ভালো-মন্দের মিশ্রণ লক্ষণীয়।

উল্লিখিত ফলাফল বিশ্নেষণে বলা যায়, অসহায় মানুষের পাশে জনগণ সহযোগিতার হাত বাড়াতে চায়। তবে কে প্রকৃত ভিক্ষুক আর কে নয়- এই নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট বিদ্যমান।

ভিক্ষুকরা উপার্জিত আয় থেকে কিছু সঞ্চয় করে থাকে। ২ দশমিক ৫ শতাংশের সঞ্চয় আছে; ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশের নেই এবং ৫০ শতাংশের অল্প কিছু আছে। ভিক্ষুকদের তথ্য সংগ্রহকালে আলোচনায় প্রকাশ পায়, ভিক্ষুকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি 'মধ্যস্বত্বভোগী চক্র' কাজ করছে। এই চক্র ভিক্ষুদের ভিক্ষার স্থান নির্ধারণ ও ব্যাপ্তিকাল ঠিক করে দেয় এবং ভিক্ষুকদের কাছ থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে মাসোয়ারা নিয়ে থাকে। এই মাসোয়ারা দিতে ব্যর্থ হলে ভিক্ষুকদের ওপর নির্যাতন এবং ভিক্ষা করতে বাধা দেওয়া হয়। গবেষণার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো- ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন এবং সমাজে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে কীভাবে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। এ বিষয়ে ভিক্ষুুকরা বেশ কিছু প্রস্তাব উল্লেখ করেছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে যা ভাবা হচ্ছে এবং এর জন্য প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সহায়ক উপকরণের জোগান খুবই অপ্রতুল। ভিক্ষাবৃত্তি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; প্রয়োজন বিকল্প কর্ম-উৎসের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ ও আয়ের নিশ্চয়তা। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভিক্ষুকদের খাদ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। অন্যদিকে, বয়সের ভারে ন্যুব্জ ভিক্ষুকদের আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চয়তা প্রদান। এদের বিকল্প কর্মের বাইরে রাখা। গবেষকের পর্যবেক্ষণে দৃশ্যমান, দীর্ঘদিন ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত থেকে মনস্তাত্ত্বিক অভিযোজন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সহজে এই বৃত্তি থেকে কেউ সরে আসতে চায় না। স্বাধীনভাবে আয় করতে পারে, এমন কিছু উদ্ভাবন; ব্যাপক সচেতনতা ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দসহ সত্যিকার পরিস্থিতি যাচাই করে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে উত্তরণের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।