রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিল। টিপুকে দুনিয়া থেকে সরাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ-প্রকাশ গ্রুপের অন্যতম কিলার সুমন শিকদার মুসার সঙ্গে ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি করেন আওয়ামী লীগ নেতা ওমর ফারুক। এর মধ্যে মুসাকে ৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন ফারুক। টাকা হাতে পেয়ে ১২ মার্চ দুবাই চলে যান মুসা। বিদেশে বসেই ভাড়াটে কিলারদের মাধ্যমে শাহজাহানপুরের হত্যা মিশন সম্পন্ন করেন। র‌্যাব বলছে, আ'লীগ নেতা টিপু হত্যার 'অন্যতম পরিকল্পনাকারী' ফারুক। তিন-চার মাস ধরে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

শুক্রবার রমনা ও মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ফারুকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার বাকি তিনজন হলেন- আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ (৩৮), নাসির উদ্দিন ওরফে কিলার নাসির (৩৮) ও মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্যা পলাশ (৫১)। র‌্যাব জানায়, ধরা পড়া চারজনই ২০১৩ সালে হত্যার শিকার যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক মিল্ক্কীর অনুসারী। টিপুকে গুলির পর আসামিরা একজন আরেকজনকে মেসেজ দেয় 'ইট ইজ ডান'। এর আগে টিপু হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একমাত্র শুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশ ও আরফান উল্লাহ ওরফে দামালকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১৬ সালে মতিঝিলে খুন হন যুবলীগ কর্মী রিজভী হাসান ওরফে 'বোঁচা বাবু'। ওমর ফারুক, মুসা, আবু সালেহ শিকদার ও নাসির উদ্দিন ২০১৬ সালে মতিঝিলের বাবু হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। মতিঝিলকেন্দ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ছাড়াও বাবু ও তার আগে রিয়াজুল হক মিল্ক্কী হত্যা ঘিরে টিপুর সঙ্গে এই চক্রের দ্বন্দ্ব চলছিল। এ কারণেই টিপুকে নিশানা করতে অর্থের বিনিময়ে দেশে-বিদেশে অবস্থান করা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করেন ওমর ফারুক।

ওমর ফারুক মতিঝিল ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। যে ওয়ার্ডে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা সেই ওয়ার্ডেই টিপুর হোটেল ও ফার্মেসি, মার্কেটমহ নানা ধরনের ব্যবসা রয়েছে। হোটেলে নিয়মিত বসতেন টিপু। এ ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি করতেন তিনি। পাশাপাশি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও ছিলেন টিপু।

গতকাল কারওয়ান বাজারে মিডিয়া সেন্টারে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন ব্রিফ করে টিপু হত্যা মামলার নানা তথ্য সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, বছরের পর বছর টিপুর সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিসহ মতিঝিলকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদ ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের অপরাধীদের দ্বন্দ্ব ছিল। মতিঝিল এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, স্কুল-কলেজের ভর্তি বাণিজ্য, কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই দ্বন্দ্ব। ২০১৩ সালে যুবলীগ নেতা মিল্ক্কী খুন হন। আসামিদের চারজনই মিল্ক্কীর অনুসারী। তারা বিশ্বাস করেন, মিল্ক্কী হত্যাকািেমল্ক্কী হত্যার পরে বিচারের দাবিতে টিপুর বিরুদ্ধে পোস্টারিং, মিছিল, মানববন্ধন, আলোচনা সভা করেছিলেন তারা। পরে টিপু অব্যাহতি পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে ওমর ফারুক এবং তার সহযোগীদের স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণে ২০১৬ সালে রিজভী হাসান ওরফে 'বোঁচা বাবু' খুন হন। বাবু ছিলেন টিপুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বাবু হত্যা মামলায় পুলিশ ওমর ফারুক, আবু সালেহ শিকদার ও নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। সেই মামলাটি বর্তমানে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে রায়ের অপেক্ষায় আছে। মামলার গতিপথ বদলাতে ওই মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামিরা মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্যা পলাশকে সাক্ষী বানায়। গ্রেপ্তারকৃতরা অর্থের বিনিময়ে বাবু হত্যা মামলায় কাইল্যা পলাশকে সাক্ষী প্রদানে বিরত থাকতে চাপ দেন। এতে পলাশ রাজি থাকলেও টিপুর চাপে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য হন। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের সঙ্গে টিপুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে অংশ নেন পলাশ। ফারুক ও মুসাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকজন সন্ত্রাসীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।

জানা গেছে, বোঁচা বাবুর হত্যাকাে র ঘটনায় মামলা করেছিলেন তার বাবা আবুল কালাম। কিন্তু মামলার যাবতীয় খরচসহ সবকিছু দেখভাল করছিলেন টিপু। আসামিরা ৫০ লাখ টাকা দিয়ে মামলার দফারফার জন্য টিপুকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এতে টিপু রাজি হননি। গ্রেপ্তারকৃতদের আশঙ্কা ছিল, টিপুর কারণেই মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে গেছে এবং বিচার দ্রুত হচ্ছে। তাদের এও আশঙ্কা ছিল, এই মামলায় তাদের কারও ফাঁসি হবে। তাই মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে প্রথমে মামলার বাদী আবুল কালামকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। সাক্ষ্য শেষে আদালত চত্বরেই বাবুর বাবাকে হত্যার প্রাথমিক ছকব ছিল। পরে আসামিরা ভেবে দেখলেন, বাদীর পরিবর্তে টিপুকে হত্যা করলে মামলার কার্যক্রম ব্যাহত করা যাবে। তাই চূড়ান্তভাবে তাকেই নিশানা করা হয়।

র‌্যাব জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা তাদের জানিয়েছে, তারা হত্যাকারী ও সহযোগীকে চেনেন না। হত্যাকারীকে ভাড়া করা থেকে শুরু করে যাবতীয় পরিকল্পনার সমন্বয়কারী মুসা। হত্যাকাে র দিন নাসির ও পলাশ এজিবি কলোনি থেকে টিপুকে অনুসরণ করেছেন। আর ওমর ফারুকও শাহজাহানপুর এলাকায় ছিলেন। টিপুর গতিবিধি তাৎক্ষণিকভাবে মুসাকে জানিয়েছেন তারা। আর মুসা সে আপডেট জানিয়েছেন হত্যাকারীদের। টিপুকে গুলির পর মুসাকে মেসেজ দেয় নাসির- 'ইট ইজ ডান'।

র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে বিকাশ, প্রকাশ, মানিক ও মোল্লা মাসুদের নাম বেশি শোনা গেছে। এ ঘটনায় আন্ডারগ্রাউন্ডের কিছু লোক জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছি। বিদেশ থেকে টিপুকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এর প্রমাণও পাওয়া গেছে।

র‌্যাব জানায়, চুক্তির টাকার মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা দুবাই পালিয়ে যাওয়ার আগেই ফারুকের কাছ থেকে নিয়েছেন মুসা। পরে হুন্ডির মাধ্যমে তার কাছে আরও চার লাখ টাকা পাঠানো হয়। বাকি ছয় লাখ টাকা দেশে হস্তান্তর করার কথা ছিল।

হত্যার প্লটের সমন্বয়কারী মুসাকে দুবাই থেকে ফিরিয়ে আনতেও কাজ করা হবে। এখন তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দুবাইয়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আদান-প্রদান করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে যথাযথভাবে দুবাই কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে। পাশাপাশি হত্যায় জড়িত শামীম ওরফে মোল্লা শামীমকেও খোঁজা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ওমর ফারুকের কারণে মহানগর আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তার দায়ভার তো মহানগর আওয়ামী লীগ নিতে পারে না। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ৪৭ ধারায় তাকে বহিস্কার করা হয়েছে।

২৪ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদ এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলিতে খুন হন জাহিদুল ইসলাম টিপু।