বাঙালিয়ানায় টেবিলে থরে থরে সাজানো হরেক রকমের ঐতিহ্যবাহী দেশি খাবার। একই সঙ্গে রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বেঙ্গালুরুর জনপ্রিয় সুস্বাদু খাবার। 'বাটার চিকেন' উত্তর ভারতীয়দের কাছে এমনই আইটেম, যেমন পিৎজা ইতালিয়ানদের। এ রকম টেস্টি গ্রেভি ঝোলের সঙ্গে খাস্তা রসুন নান মুখে চালান করে দিলে ইয়াম ইয়াম করতে করতে স্বাদে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আর মনে হবে মুখের ভেতরে যেন এক প্রকার 'ফুড হেভেন' সৃষ্টি হয়েছে। 'গরুর মেজবানি মাংস'ও সেই রকম খাবার। এই দুই খাবারের স্বাদ নিতেই রাত ২টার পর থেকে উত্তরার হ্যাভিলি রেস্টুরেন্টে ভিড় জমান ভোজনরসিকরা। শুধু হ্যাভিলিই নয়, রাজধানীর ধানমন্ডি, বনানী ও পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্টেও চলছে সেহরির বিশেষ আয়োজন।

শুক্রবার মধ্যরাতে উত্তরার হ্যাভিলি রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি টেবিলে দেশি খাবারের পাশাপাশি রয়েছে ভারতের জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি খাবার। এর মধ্যে কয়েকটি টেবিলে রাখা হয়েছে সাদা ভাতের সঙ্গে গরুর মেজবানি মাংস, চিকেন বাটার মাসালা, ডাল বাটার ফ্রাই, তাওয়া মিক্সড ভেজিটেবল, ফ্রেশ গার্ডেন সালাদ ও আমন্ড ক্ষীর ফিরনি। এই প্যাকেজের নাম রাইস প্লাটার। এখানকার বেশ জনপ্রিয় প্যাকেজ এটি। পাশের টেবিল থেকেই রসালো চিকেন কাবলি বিরিয়ানির সুস্বাদু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। বিরিয়ানি কিংবা তেহারি খেতে ভালোবাসেন এমন ভোজনরসিক ক্রেতাদেরও দেখা মিলেছে। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় সাজানো হয়েছে 'আস্ত খাসির ট্রাডিশনাল রোস্ট'। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম একটি খাবার এই খাসির রোস্ট। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে রান্নার চল থাকলেও ট্রাডিশন হচ্ছে পুরো খাসি একবারে রান্না করা। এ রেস্টুরেন্টের প্রধান রন্ধনশিল্পী (শেফ) মোহাম্মদ মোস্তফা সমকালকে বলেন, খাবারের পূর্ণ স্বাদ দিতে আমরা সচেষ্ট। এখানে কোনো টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হয় না। গ্রামগঞ্জের মা-খালাদের মতোই রান্নায় সব বাটা মসলা ব্যবহার করা হয়; যা খাবারে ভিন্ন স্বাদ আনে। প্রায় দেড়শ রেসিপি থাকলেও রমজান উপলক্ষে সেহরির বিশেষ আয়োজনে তিন প্যাকেজে সাদা ভাত ও চিকেন কাবলি বিরিয়ানিসহ ১৮ রকমের সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। রাইস প্লাটার প্যাকেজের মূল্য ৭৫০ টাকা, বিরিয়ানি প্লাটার ৫৯৯ টাকায় এবং পুরো পরিবারের জন্য (৭ থেকে ১০ জন) হ্যাভিলি সিগনেচার প্লাটার ১৫ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

উত্তরার একমাত্র রেস্টুরেন্ট হ্যাভিলি, যেখানে ২০১৮ সাল থেকে সেহরির আয়োজন করা হয়। তবে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে গত দুই বছর বেশ সংকট পোহাতে হয়েছে। আয়োজনও তেমন ছিল না। এখানকার মোট কর্মীর ৫ ভাগকে ছাঁটাই করা হয়। তবে এবারের রমজানে নতুন উদ্যমে সেহরির আয়োজন করেছে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ। কর্মীও নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রেস্টুরেন্টের পরিচালক শিহাব উদ্দিন ঢালী বলেন, রমজান মাসে মধ্যরাতে সেহরি আয়োজনে ব্যস্ত থাকে সবাই। তার পরও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় খাবার খেতে এখানে ছুটে আসেন অনেকেই। এবার ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। রাত ২টা থেকেই ভোজনরসিকরা ছুটে আসেন। এ রেস্টুরেন্টে গত রাতে এসেছিলেন স্পেনের বাসিন্দা আলফানজো ও তার এক বন্ধু। তারা নিয়মিত এ রেস্টুরেন্টে এলেও সেহরির বিশেষ খাবারের স্বাদ পেতে মাঝরাতেই খেতে এসেছেন।

অতিথি ও পরিবারের তিন সদস্যকে নিয়ে এসেছিলেন খন্দকার সেলিমা রওশন। তিনি বলেন, 'প্রতি রমজানেই সেহরি খেতে রাজধানীর বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে যাই। এবার এসেছি হ্যাভিলিতে। ইন্ডিয়ান ফুডের স্বাদ পেতে এটা বেস্ট।'

এদিকে ধানমন্ডির এস মোরস ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে পরিবারের ৯ সদস্যকে নিয়ে সেহরির আয়োজনে গিয়েছিলেন সারাহ দিনা। তিনি বলেন, পরিবারের সবাই একসঙ্গেই এসেছি এ রেস্টুরেন্টে। বাচ্চারাও আছে। এখানে বুফে আইটেম ছিল। দুই রকম স্যুপ, চিকেন ফ্রাই, পোলাও, ফ্রাইড রাইস, চিকেন, চিংড়ির বিদেশি আইটেমসহ দেশি মজাদার সব খাবার। যেমন- ভাত, গরুর মাংস, খাসির মাথা দিয়ে ডাল, পালংশাক ইত্যাদি। বেশ কয়েক ধরনের সালাদও ছিল। দেশি-বিদেশি ডেজার্ট ছিল। সেই সঙ্গে জুস ও কফি। ৬০০ টাকার মধ্যেই এ প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে।' একই এলাকার অ্যাবসুলেট বারবিকিউ ও গুলশানের তারকা রেস্টুরেন্টেও রয়েছে সেহরির আয়োজন। পশ্চিমা একাধিক দেশের সুস্বাদু সব খাবারের সম্ভার। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পরিবারের সবাইকে নিয়েই অনেক ভোজনরসিক মানুষ এসব রেস্টুরেন্টে সেহরি খেতে আসছেন।

পুরান ঢাকায় খোলা আকাশের নিচে সেহরি: ঐতিহ্যবাহী দেশি খাবারের স্বাদ পেতে অনেকেই বন্ধু-বান্ধব, পরিবার নিয়ে সেহরি খেতে ছুটছেন পুরান ঢাকায়। প্রতি বছরের মতো এবারও নাজিরা বাজারের তারাবাত ও আল-মদিনা হোটেল খোলা আকাশের নিচে সেহরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত ২টার পর থেকেই সেখানে ভোজনরসিকদের ভিড় দেখা যায়। এ সময় অতিরিক্ত চাপ সামলাতেই খোলা আকাশের নিচে সামিয়ানা টাঙিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানায় হোটেল কর্তৃপক্ষ। আলাউদ্দিন রোডে হাজি বিরিয়ানির গলিতেও খোলা আকাশের নিচে চলছে সেহরির আয়োজন। সেহরির মেন্যুতে রয়েছে পরোটা, নানরুটি, সবজি, বুন্দিয়া, ডিম ভাজা, সাদা ভাত, ডাল, গরুর মাংসের রেজালা, মুরগির রোস্ট-রেজালা, গরুর বট ইত্যাদি। গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই লেট নাইটে ছুটে যান পুরান ঢাকার এসব রেস্তোরাঁয়। মোবাইলে সেলফি তুলে তা ছড়িয়ে দেন ফেসবুকেও। আগে সংবাদকর্মী হলেও বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় আছেন মামুন। তিনি বন্ধুদের নিয়ে শুক্রবার রাতে গিয়েছিলেন পুরান ঢাকার তারাবাতে। তিনি বলেন, পুরান ঢাকার খাবারের মানই আলাদা। স্বাদে-গুণে অতুলনীয়। তাই প্রতি বছর বন্ধুরা দলবেঁধে ছুটে আসি। এটা আমাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও এসেছি।