'টিপু প্রকাশ্যে থাকলেও তাকে চালাত আন্ডারওয়ার্ল্ডের লোকজন। মাফিয়ারা এখন নতুন টিপু তৈরি করবে। এরই মধ্যে নানা পক্ষ সক্রিয়ও হয়ে গেছে'- মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে হত্যার পর পরিস্থিতির খোঁজখবর নিতে গিয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে তার মোদ্দা কথা এমনই দাঁড়ায়।

মতিঝিল এলাকার রাজনীতির ভেতর-বাইরের খোঁজ রাখেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, টিপুসহ দু'জনকে হত্যার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে ঠিকই; কিন্তু রাজনীতিকে ঢাল বানিয়ে অঢেল টাকা কামানো পক্ষগুলো আতঙ্কে নেই। বরং টিপুর 'সাম্রাজ্য' দখলে নিতে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের পদধারী দুই নেতাকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে দখল-পাল্টা দখলের গোপন মহড়া।

ওই এলাকার রাজনীতিতে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ওই দুই নেতার আড়ালে সবকিছুর লাগাম কয়েকজন পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীর হাতে। তারা যাদের চাইবে, তারাই হবে মতিঝিলের নিয়ন্ত্রক।
গত ২৪ মার্চ রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করা হয় টিপুকে। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান পথচারী এক ছাত্রী।

একসময়ের বৃহত্তর মতিঝিল এলাকা এখন মতিঝিল, পল্টন ও শাহজাহানপুর- এই তিন থানায় বিভক্ত। তবে আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের হিসাব কষা হয় অভিন্ন মতিঝিল ঘিরেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র বলছে, মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ হয় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি, জাফর আহমেদ মানিক ওরফে ফ্রিডম মানিক, নাছির এবং সুমন সিকদার ওরফে মুসাকে ঘিরে। মুসা এতদিন দেশে থাকলেও টিপু হত্যাকাণ্ডের আগে ১২ মার্চ দুবাই চলে যান। হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব জানিয়েছিল, এই মুসাই দুবাই বসে পুরো হত্যা মিশন সমন্বয় করেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, একসময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্ক্কী পুরো মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছিলেন। ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই তাকে হত্যার পর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অন্য পক্ষের হাতে। দক্ষিণ যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমের হাতে চলে যায় ওই এলাকার প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ। ক্যাসিনোবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে ওই তিন নেতা গ্রেপ্তার হলে পলাতক সন্ত্রাসীদের সহায়তায় আবির্ভাব ঘটেছিল জাহিদুল ইসলাম টিপুর। কিন্তু ঠিকঠাক ভাগবাটোয়ারা না দেওয়া এবং 'সমীহ' না পাওয়ায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে সন্ত্রাসীরা।

পুলিশের এমন একাধিক কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের সূত্র বলছে, টিপু হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকায় নড়েচড়ে বসেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আশরাফ তালুকদারের অনুসারীরা। আশরাফ একসময় মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়াও সক্রিয় হয়েছেন একই ইউনিটের উপদেষ্টাম লীর সদস্য ইসমত জামিল আখন্দ ওরফে লাভলুর অনুসারীরা। আধিপত্য নিয়ে বিরোধ থাকলেও দুই নেতা কখনোই প্রকাশ্যে আসেন না।

টিপুর 'সাম্রাজ্যে' সক্রিয় যারা :দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গোলাম আশরাফ তালুকদার প্রকাশ্যে না থাকলেও তার হয়ে পল্টন থানা আওয়ামী লীগের পদধারী এক নেতা পল্টন এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন। ওই নেতা টিপু মার্ডারের কয়েকদিন আগে বিদেশ যান। ওই নেতার হয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে পল্টন থানা ছাত্রলীগ থেকে একসময়ে বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক জয় এবং শরীফ নামের একজন। গোটা পল্টন এলাকার অবৈধ মাদক রাজ্য চালান এই দু'জন।

১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের এক পদধারী নেতার হয়ে শান্তিনগর বাজারের নিয়ন্ত্রণ করেন আদম আলী নামের এক ব্যক্তি। তিনি বাজারে জুয়ার বোর্ডও চালান নিয়মিত। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওই নেতার হয়ে পল্টন, বায়তুল মোকাররম, স্টেডিয়াম এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। শান্তিবাগ, মালিবাগ ও শহীদবাগ এলাকায় গোলাম আশরাফ তালুকদারের লোক হিসেবে পরিচিত মাজহারুল ইসলাম তুহিন। এই তুহিন আবার খালেদের বন্ধু। রেললাইনের মাদক রাজ্য তুহিনের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে।

মতিঝিল থানার ৯ নম্বর ওয়ার্ড এলাকা আরামবাগ, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও বঙ্গভবন এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণ গোলাম আশরাফ তালুকদারের লোকজনের হাতে। ১১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত শাহজাহানপুর এলাকায় তার হয়ে কাজ করছেন কামরুজ্জামান বাবুল। তাকে সবাই চেনে ফ্রিডম মানিকের লোক হিসেবে। সেই পরিচয়ে তার নামেই চলে ওই এলাকা।

জানতে চাইলে গোলাম আশরাফ তালুকদার সমকালকে বলেন, 'আমি একসময় মতিঝিলের রাজনীতি করলেও দল থেকে আমাকে ঢাকা-৭ আসনের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন আর ওই এলাকার রাজনীতির খোঁজ রাখি না।'

টিপু মার্ডারের পর মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ তার অনুসারীরা নিতে চাইছে- এমন প্রশ্নে গোলাম আশরাফের দাবি, 'আমি এ ধরনের রাজনীতি করি না। পলাতক কোনো সন্ত্রাসীর সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। কখনও ছিলও না।'

পলাতক ফ্রিডম মানিক ও কারাবন্দি খালিদের সঙ্গে ইসমত জামিল আখন্দ লাভলুর সখ্যের বিষয়টি মতিঝিল এলাকার সবার জানা। সূত্রগুলো বলছে, এই নেতার নাম করে কারাবন্দি খালেদের লোকজনও সক্রিয় হয়েছে। খালেদের লোক হিসেবে চিহ্নিত অঙ্কুর ও রাজু এখন শাহজাহানপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া। অঙ্কুর শাহজাহানপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসম্পাদক, রাজুও মহানগর যুবলীগে সক্রিয়।

মতিঝিলের ৮নং ওয়ার্ড এলাকা কমলাপুরে সেলিম, সাবেক জাসদ ছাত্রলীগের নেতা আহকাম উল্লাহর নিয়ন্ত্রণে কমলাপুর আইসিডির নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও কমলাপুর কাঁচাবাজার ও ওই এলাকায় সরকারি জায়গা দখলে তারা যুক্ত। আহকাম উল্লাহ ফ্রিডম মানিকের আপন খালাতো ভাই বলে ওই এলাকার লোকজন জানিয়েছেন। তাদের হয়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়ায় সাকি ও ইসমাইল নামে আপন দুই ভাই। তারা ওই এলাকার ট্রাকস্ট্যান্ড ও বাসস্ট্যান্ডও নিয়ন্ত্রণ করে।

মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইসমত জামিল আখন্দ লাভলুকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হয়। ফোন রিসিভ হয়নি।
এর বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহায়তায় মতিঝিলের গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক ওরফে কানা ফারুক। তার হয়ে বাচ্চু নামে একজন এজিবি কলোনি, টিঅ্যান্ডটি কলোনি ও বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি নিয়ন্ত্রণ করত। তবে টিপু হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও অর্থদাতা হিসেবে ফারুককে গ্রেপ্তারের পর তাদের লোকজন গা ঢাকা দিয়েছে। একইভাবে গা ঢাকা দিয়েছে একসময়ের মতিঝিল এলাকার নিয়ন্ত্রক আবু সালেহ ওরফে শুটার সালেহ, কিলার নাছির ও কাইল্লা পলাশের লোকজনও। ওই তিনজনকেও টিপু হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তবে তাদের লোকজনই ফের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করবে বলে আশঙ্কা মতিঝিলের বাসিন্দাদের।

টিপুর লোকজন কোণঠাসা :টিপুর হয়ে মতিঝিল এলাকার ক্রীড়া পরিষদ ভবনসহ বিভিন্ন ভবনের নিয়ন্ত্রণ করতেন ১০ নম্বর ওয়ার্ডের হিরক, আমিনুল ও মিরাজ। টিপু হত্যাকাণ্ডের সময়ে মিরাজ একই মাইক্রোবাসে ছিলেন। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের মামাশ্বশুর এবং একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী লিটনের (নিহত) আপন বড় ভাই। তা ছাড়া টিপুর হয়ে আইডিয়াল স্কুলসহ ওই এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, কেনাকাটা ও ভর্তি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন সোহেল সিদ্দিকী নামের এক ব্যক্তি। তবে টিপু মার্ডারের পর তারা কোণঠাসা। তাদের অনেকেই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন মেরূকরণে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
মতিঝিল এলাকার দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, খালেদ কারাগার থেকেই মতিঝিলের একটা অংশ নিজের বলয়ে রাখলেও সম্রাটের লোকজন একেবারেই কোণঠাসা ছিল। সম্প্রতি সম্রাট আদালত থেকে একটি ছাড়া সব মামলায় জামিন পাওয়ায় তার অনুসারীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনুসারীদের ধারণা, আর একটি মামলায় জামিন হলেই কারামুক্ত হবেন সম্রাট। এজন্য ফের মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্রিয় তারাও।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আব্দুল আহাদ বলেন, নতুন করে যাতে গ্রুপ সৃষ্টি করতে না পারে, আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে যাতে হানাহানি না হয় সে বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তার ভাষ্য, অবৈধ বা অপরাধমূলক সন্ত্রাসী কর্মকা কেউ করার চেষ্টা করলে ছাড় দেওয়া হবে না। এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।