মাত্র ২৯ দিনের ব্যবধানে তিন-তিনটি যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক তিনটি বিভাগে। বাংলা, ব্যবস্থাপনা ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর এই অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে বাংলা বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি ব্যবস্থা নিয়েছে। অন্যদিকে, চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার। আর ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন বিভাগেরই এক প্রাক্তন ছাত্রী।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র এক মাসের মধ্যে পর পর তিনটি যৌন হয়রানির ঘটনার অভিযোগ যথেষ্ট শঙ্কার বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় পৌঁছেও নারীরা যদি নিরাপদ বোধ না করেন, তবে তা খুবই দুঃখজনক। আমার বিশ্বাস, নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে অভিযোগ খতিয়ে দেখবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সমকালকে বলেন, যখন যে অভিযোগই আসুক না কেন, প্রতিটিই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি আছে। রোকেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা ওয়াহিদ এ কমিটির প্রধান। কমিটি পুরোপুরি কার্যকর। সব অভিযোগই তারা খতিয়ে দেখবেন।

গত মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছে অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের লিখিত অভিযোগ দেন বিভাগেরই এক ছাত্রী। ২৯ মার্চ বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় অভিযোগটি উত্থাপিত ও আলোচিত হয়। কমিটি সর্বসম্মতভাবে বিশ্বজিৎ ঘোষকে সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়াসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ১৮ এপ্রিল বাংলা বিভাগের একাডেমিক কমিটির জরুরি সভায় অভিযোগের চিঠি উচ্চপর্যায়ে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে অন্য সিদ্ধান্তগুলো বহাল রয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো হলো সব একাডেমিক কার্যক্রম (সব ধরনের ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষায় প্রত্যক্ষণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, এমফিল-পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধান, পরীক্ষা কমিটির কাজে অংশগ্রহণ প্রভৃতি) থেকে বিশ্বজিৎ ঘোষকে অব্যাহতি দেওয়া, ভবিষ্যতে তাকে কোনো একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত না করা, সমন্বয় ও উন্নয়ন (সিঅ্যান্ডডি) ও একাডেমিক কমিটির সভায় তাকে না ডাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে তার নামে বরাদ্দ থাকা বিভাগীয় কক্ষ বাতিল, আরও বৃহত্তর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে কিনা- অভিযোগকারীর মতামত সাপেক্ষে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তদন্তের সময়ও একাডেমিক কমিটির এসব সিদ্ধান্ত বহাল রাখা।
অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষের বাংলা বিভাগ থেকে ২০২৩ সালে অবসরে যাওয়ার কথা। তিনি ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে এ বছর বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার প্রতি বৈষম্য করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাবির যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে অধ্যাপক আকরামের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট। স্থগিত করা হয়েছে বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ কার্যক্রম।

গত ৩১ মার্চ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে দুই জন ও অস্থায়ী প্রভাষক পদে দুই জনকে নিয়োগের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে এপ্রিলে মৌখিক নিয়োগ পরীক্ষার পর সহকারী অধ্যাপক পদে বিভাগের দু'জন শিক্ষক ও অস্থায়ী প্রভাষক পদে দু'জনের নাম সুপারিশ করে সিন্ডিকেটে পাঠায় সিলেকশন বোর্ড। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর ওই বিভাগের প্রাক্তন এক ছাত্রী লিখিত অভিযোগ করেছেন যে, অধ্যাপক আকরাম হোসেন তাকে প্রথমে ২০১৮ সালে যৌন হয়রানি করেন; চলতি বছর তিনি প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাবি যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে এ বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয় এবং প্রভাষক পদের নিয়োগ স্থগিত করা হয়। সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ বহাল রয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের আগে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী এ ব্যাপারে অধ্যাপক আকরাম হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি 'অনৈতিক ও ঘৃণ্য প্রস্তাব' দেন, যা অগ্রাহ্য করায় সেবারের নিয়োগে তাকে সুপারিশ করা হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১০ মে ওই শিক্ষার্থী অধ্যাপক আকরামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
চলতি বছর বিভাগের প্রভাষক নিয়োগের সময় ওই শিক্ষার্থী বিবিএ এবং এমবিএ উভয় পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিয়োগের জন্যে অধ্যাপক আকরাম সুপারিশ করেননি। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর প্রতি যৌন হয়রানি এবং নিয়োগ বৈষম্যের দুটি অভিযোগপত্রের কপিই সমকালের হাতে রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক আকরাম হোসেন বলেন, '২০১৮ সালে নিয়োগ না পাওয়ায় ২০১৯ সালের মে মাসে অভিযোগকারী তৎকালীন ডিন বরাবর অভিযোগ করেন। কিন্তু সেটির রিসিভড কপি ছিল না। ওই সময় আমি সিলেকশন বোর্ডেও ছিলাম না কিংবা চেয়ারম্যানও ছিলাম না। এবার উনি সুপারিশপ্রাপ্ত হননি বলে আবারও অভিযোগ করেছেন। তিনি কি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন নাকি চাকরি চাইছেন? তিনি যদি সুপারিশপ্রাপ্ত হতেন, তাহলে কি উনি অভিযোগ করতেন না?'
যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. আখতারুজ্জামান সিনবাদের বিরুদ্ধেও। অভিযোগ যাচাই করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সমকালকে জানিয়েছেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। এর অংশ হিসেবে 'ফ্যাক্ট চেকিং' কমিটি করার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, প্রাথমিক যাচাইয়ে ঘটনার সত্যতা মিললে এ অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটিতে পাঠানো হবে।

তবে এ ঘটনা অস্বীকার করে শিক্ষক আখতারুজ্জামান বলেন, 'ঘটনাটা টোটালি মিথ্যা ও বানোয়াট। এরকম কোনো কিছু আমার সঙ্গে ঘটেনি। হয়তো কেউ আমার শিক্ষকতা, আমার ক্যারিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ ধরনের কারসাজি করছে।'
লিখিত অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী বুয়েট ছাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শী ঢাবি শিক্ষার্থীরা বলেন, গত ১৪ এপ্রিল মঙ্গল শোভাযাত্রার পর চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে সেখানকার বন্ধুদের সঙ্গে বুয়েটের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ওই শিক্ষার্থী বসেছিলেন। এ সময় শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক আখতারুজ্জামান সিনবাদ বুয়েট শিক্ষার্থীকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত বখাটেদের মতো শিস দিতে থাকেন। একপর্যায়ে নিপীড়িত শিক্ষার্থী তার দিকে সরাসরি তাকালে তিনি 'অশ্নীল মুখভঙ্গি'র পাশাপাশি ইঙ্গিতপূর্ণ চোখ টিপ দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। লিখিত অভিযোগে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, পরে আখতারুজ্জামান সিনবাদ হুমকি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে কৃতকর্মের কথা স্বীকার করেন এবং বুয়েট শিক্ষার্থীর সঙ্গী বন্ধুকে বিভিন্ন জিজ্ঞাসার মাধ্যমে দমনমূলক আচরণ করেন।

শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান ও চারুকলার অনুষদের ডিনের কাছে দেওয়া এ অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১৩ জন শিক্ষার্থী সই করেছেন। অভিযোগপত্রে শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কখনোই কাম্য নয়। তারা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের বর্তমান শিক্ষার্থী পুলক বাড়ৈ এবং সাবেক শিক্ষার্থী শুভ বাড়ৈও ওই শিক্ষার্থীদের 'যৌন হেনস্তা' করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।