মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন-তিনটি যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠা সত্যিই উদ্বেগজনক। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন ন্যক্কারজনক সবক'টি ঘটনায় অভিযুক্ত হলেন শিক্ষক; শিক্ষার্থীদের কাছে মা-বাবার পরেই যাদের স্থান। শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওই বিভাগেরই শিক্ষার্থীর করা প্রথম অভিযোগটি বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছে জমা পড়ে গত মার্চে। দ্বিতীয় অভিযোগটি আসে একই মাসে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ওই বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে এবারের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকালে চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগে। ওই অনুষদের ডিনের কাছে ভুক্তভোগীর দেওয়া অভিযোগ অনুসারে, ওই দিন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করেছেন ওই বিভাগের এক শিক্ষক। উল্লেখ্য, এমআইএস বিভাগের শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ওই শিক্ষক ২০১৮ সালে তাকে যৌন হয়রানি করেন; এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ২০১৯ সালের মে মাসে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অনুষদের তৎকালীন ডিন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এরই জের হিসেবে বিভাগীয় শিক্ষক নিয়োগের সময় ওই শিক্ষক তার বিরুদ্ধে 'বৈষম্যমূলক' আচরণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন করার ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল, তা নয়। এর আগেও বহুবার ছাত্রীদের তরফ থেকে এমন অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে বহু ছাত্র আন্দোলন হয়েছে এবং ভুক্তভোগী ছাত্রীরা প্রতিকারও পেয়েছেন। কিন্তু এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার ঘটনা এর আগে ঘটতে দেখা যায়নি। তাছাড়া বিশেষত যৌন নিপীড়নবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফল হিসেবে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এখন যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি আছে। সে কমিটি ইতোপূর্বে এ ধরনের বেশ কিছু অভিযোগের সুরাহাও করেছে, যেখানে অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু তা যে এখনও যৌন হয়রানিমূলক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে খুব একটা সক্ষম হচ্ছে না- আলোচ্য ঘটনাগুলো তারই সাক্ষ্য দেয়। এমনকি হতে পারে, অতীতের ঘটনাগুলোতে অভিযুক্ত শিক্ষকদের যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা ছিল গুরু পাপে লঘু দণ্ডের মতো? এ প্রশ্নের উত্তরে যা-ই বলা হোক, এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের সমাজের সর্বত্র বহু বছর ধরে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় চলছে, তা থেকে শিক্ষক সমাজও মুক্ত নয়। তা না হলে, যে শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীর ন্যায়নীতি-মূল্যবোধের পাঠ নেওয়ার কথা, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে যে কোনো বিপদ-আপদে যার কাছে শিক্ষার্থীর আশ্রয় পাওয়ার কথা; তিনি তারই শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন অভব্য ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারতেন না।
উল্লিখিত যৌন হয়রানিমূলক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার কারণ হলো, ঘটনাগুলো ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাতিঘরের ভূমিকা পালন করেছে। তা ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রীদের সঙ্গে খোদ শিক্ষকদের তরফ থেকে এমন ঘৃণ্য আচরণ যদি চলতেই থাকে, তাহলে তা সংশ্নিষ্ট ছাত্রীদের একাডেমিক ও এমনকি ব্যক্তিগত জীবনকে শুধু বিপর্যস্তই করবে না; অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত নারী শিক্ষার প্রসারও বাধাগ্রস্ত হবে। এর কুফল ভোগ করতে হবে পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকে। কারণ, পুরুষের পাশাপাশি নারীর মেধা ও মননকে কাজে না লাগিয়ে কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না; তা এখন পরীক্ষিত সত্য। আশার কথা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উল্লিখিত অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন। তার এ আশ্বাস যে নিছক কথার কথা নয়- তার প্রমাণও ইতোমধ্যে মিলেছে। সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, বাংলা বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যৌন হয়রানির অভিযোগটি গত ২৯ মার্চ বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় উত্থাপিত ও আলোচিত হয়। কমিটি সর্বসম্মতভাবে ওই শিক্ষককে সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়াসহ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যৌন হয়রানির অন্য অভিযোগগুলোও বর্তমানে তদন্তাধীন বলে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব শুভবোধসম্পন্ন মানুষকে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই।

বিষয় : ঢাবিতে যৌন হয়রানির অভিযোগ

মন্তব্য করুন