রংপুর
এহসানুল হক সুমন
বছর ঘুরে নানা উৎসব এলেও সেই অনুভূতি থাকে না রংপুর নগরীর এরশাদ মোড়ের বাসিন্দা হাসিনা বেগমের (৭০)। স্বামী রফিক মিয়া মারা গেছেন। সন্তানরাও ভরণপোষণ না দিয়ে দূরে সরে গেছেন। খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করেন। তবে এবার আনন্দ ফুটে উঠেছে হাসিনা বেগমের চোখেমুখে। ঈদের আগে শাড়ি-লুঙ্গি, আতপ চাল, ভাতের চাল, দুধ, চিনি, সেমাই, তেল, সাবানসহ খাদ্যপণ্যের ঈদ উপহার পেয়েছেন তিনি। রংপুর নগরীর মিস্ত্রিপাড়ার বাসিন্দা আয়শা বেগম। স্বামী জামাল পান বিক্রি করেন নগরীর ফুটপাতে। সড়কে যানজট কমাতে পুলিশের নিয়মিত পেট্রোলিংয়ে সেই ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঈদে তিন মাসের নবজাতককে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন আয়শা। ঈদ উপহার পেয়ে খুশি হাসিনা, আয়শা, তাজুল মিয়া, জোসনা বেগম, হাছনা বেগমসহ ২০০ অসচ্ছল পরিবার।

হাছিনা বেগম বলেন, 'স্বামী নাই, ছাওয়ার ঘরও দেকে না। মাইষে খাবার দিলে খাই, না দিলে নাই। মোর ঈদ কইতে কিচু নাই। এইবার একটা সোন্দর প্যাকেটোত ঈদের দিনের খাবার পানু। ঈদের কয়েকদিন ভালো যাইবে। যেই ছাওয়ার ঘর মোক খাবার দিচে আল্লাহ তার ভালো করুক।'
আয়শা বলেন, 'রমজান মাসোত ওমার (জামাল) কামাই নাই। বাড়িত বসি আচে। ৩ মাসের বেটিক নিয়্যা বাড়িত কোনমতে ওজা (রোজা) করতোছি। ঈদোত কী খামো, কী পড়মো চিন্তাত ছিনু। অ্যালা পোলাওয়ের চাউল, ত্যাল, দুধ, চিনি, সামাই, সাবান, শাড়ি, লুঙ্গি পানু। ঈদের দিন নয়া শাড়ি গাত দিয়া, পোলাও আন্দি খামার পামো।'

রংপুর সিটি কলেজ প্রাঙ্গণে ঈদের এসব খাদ্য ও বস্ত্রসামগ্রী পেয়ে খুশি তারা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এডব্লিউএম রায়হান শাহ। সুহৃদ সভাপতি আজহারুল ইসলাম দুলালের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন রংপুর সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব ও সমকাল রংপুর স্টাফ রিপোর্টার মেরিনা লাভলী। উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক ও সাংবাদিক হাশেম আলী, চণ্ডিপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম, সুহৃদ নভেল চৌধুরী, আরমান হোসেন, রাকিব হাছান লিখন, তারিফুল-উল ইসলাম তানিম, সুরাইয়া আক্তার, ওয়ালিউল্লাহ, নওশীন, ছন্দা রায়, আঁখি, শিশিরসহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর সরকারি কলেজ, কারমাইকেল কলেজ ও সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থীরা।
এডব্লিউএম রায়হান শাহ বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ঈদ উপহার হিসেবে দেশের গৃহ ও ভূমিহীন মানুষের ঘর উপহার দিয়েছেন, ঠিক সেই সময় সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন অসচ্ছল ব্যক্তিদের ঈদ উপহার হিসেবে খাদ্য সহায়তা ও ঈদের কাপড় বিতরণ করেছে। তাদের এ উদ্যোগটি মহৎ ও প্রশংসনীয়। সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের মতো অন্যান্য সংস্থা ও বিত্তবানকে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।'
সাধারণ সম্পাদক সুহৃদ সমাবেশ, রংপুর

কিশোরগঞ্জ
সাইফুল হক মোল্লা দুলু
বৈশাখের শুরু থেকে বোরো ধান কাটার মৌসুম চলছে সারা জেলায়। হাওরে আগাম বন্যায় আধাপাকা ধান নিয়ে কৃষক পরিবারগুলো বিপাকে পড়েছে। উজান এলাকায় চলছে খাদ্যাভাব। এ সময় ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে পড়েছে দুস্থ-অসহায় মানুষের মধ্যে। এমন বাস্তবতায় ২৫ এপ্রিল দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের এক চমৎকার আয়োজন করা হয় কিশোরগঞ্জ সরযুবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। 'ঈদে খাদ্য সহায়তা' শীর্ষক এই আনন্দঘন আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম। তিনি বলেন, এই আয়োজনে যারা উপকারভোগী তারা দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছেন। এর মাধ্যমে তারা ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও উপভোগ করতে পারবেন।

বিশেষ অতিথি পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার) বলেন, দরিদ্র মানুষের পাশে সরকার যেমন প্রণোদনা নিয়ে দাঁড়ায়, তেমনি প্রতিবছর আল-খায়ের ফাউন্ডেশন ও সমকাল সুহৃদ সমাবেশ মানবিক দায়িত্ব নিয়ে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করে আসছে। এজন্য আমি সংশ্নিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ঈদকে কেন্দ্র এই মহৎ আয়োজন মানুষের মধ্যে ঈদের প্রকৃত আনন্দ যোগ করেছে।
এ সময় অন্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুশান্ত সিংহ, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ কবীর, সদর মডেল থানার ওসি মো. দাউদ, সুহৃদের সাবেক সভাপতি বাদল রহমান, ছড়াকার জাহাঙ্গীর আলম জাহান, নারীনেত্রী ফৌজিয়া জলিল ন্যান্সি, ঈশা খাঁ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক বদরুল হুদা, সুহৃদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আসলামুল হক আসলামসহ সুহৃদ মোমিন ভূঁইয়া, ইমরান, মাহফুজা রোমা, সাব্বির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

খাদ্যসামগ্রী পেয়ে শহরের কানিকাটা গ্রামের ফাতেমা, যশোদলের জরিনা বেগম, শোলাকিয়ার সমরুদসহ অনেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক কিশোরগঞ্জ

তাহিরপুর
আমিনুল ইসলাম
তাহিরপুর উপজেলাসহ সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের প্রতিটি উপজেলায় রাত পোহালেই শোনা যায় হাওরের স্থায়ী বেড়িবাঁধ ভেঙে তাদের স্বপ্টেম্ন সোনার ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা। এপ্রিলের মাঝামাঝি পাটলাই নদীর পানি অতিরিক্তি বৃদ্ধি পেয়ে আটটি হাওরের কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ২৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের নোয়ানগর গ্রামে হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে উপহারস্বরূপ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। বেলা ১১টায় তাহিরপুর উপজেলার নোয়ানগর গ্রামে প্রতিটি হতদরিদ্র পরিবারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রায়হান কবীর। তিনি বলেন, খাদ্যসহায়তা বিতরণের জন্য প্রত্যন্ত হাওর এলাকার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের গ্রামগুলোকে বেছে নেওয়ার জন্য তিনি সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- তাহিরপুর উপজেলা সমকালের তাহিরপুর উপজেলা প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম, ইকরা বাংলা টিভির স্টাফ রিপোর্টার বেলাল আহমেদ, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি প্রবীর কর্মকার, আলোকচিত্রী সুকান্ত তালুকদার, সুহৃদ সহসভাপতি শওকত হাসান, যুগ্ম সম্পাদক সজীব চন্দ, কোষাধ্যক্ষ শঙ্কর চন্দ, সদস্য মোনায়েম শরীফ, রায়হান আহমদ প্রমুখ।

খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায় মারাল গ্রামের ৭০ বছরের বিংরাজ বিবিকে। মারালা গ্রামটি হাওরের বিচ্ছিন্ন এলাকায় অবস্থিত। সরকারি ত্রাণ ও সুযোগ-সুবিধা এখানে তেমন একটা পৌঁছায় না।

বিংরাজ বিবি বলেন, 'ছেলেরা কাম-কাজে যায় না। খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন। একসঙ্গে এতকিছু ত্রাণ পাবেন আশা করেননি। এখন রমজান মাস ও ঈদ আনন্দের সঙ্গেই উদযাপন করতে পারবেন।'
একই গ্রামের ছয়ফুল মিয়া বলেন, 'আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী। কাজকর্ম করতে পারি না। রমজান মাসটা কীভাবে কাটবে ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। এখন আর সমস্যা হবে না।'
এদিন নোয়ানগর, মারালা, শ্রীপুর, ঠাকুরহাটি, ভাটি তাহিরপুর, মধ্য তাহিরপুর, রতনশ্রী ও জামালগড় গ্রামের মানুষকেও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়।
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি