সিলেট নগরীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা শাহজালাল উপশহরের বেশিরভাগ এলাকা দু'দিন ধরে পানিতে নিমজ্জিত। প্রধান সড়কের কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কোমর পর্যন্ত তলিয়ে গেছে। বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও পানি প্রবেশ করেছে। ফলে উপশহরের ২০-২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সুরমা নদী উপচে দুই তীরবর্তী পাড়া-মহল্লা মিলে পুরো নগরীতে লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছেন। সীমান্তের ওপারে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি ভারি বর্ষণ মিলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) শত শত কোটি টাকার প্রকল্প কার্যত পরিহাসে পরিণত হয়েছে। রাস্তার পাশে ড্রেন নির্মাণে ধীরগতি ও ড্রেনের ওপরের অংশ বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতায় ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ ও ছড়া-খালে বৃষ্টির পানি টানতে না পারায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।

তবে সিসিক কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সুরমা নদী উপচে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বন্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। সোমবার রাতের ঝড়ে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। এতে নগরীর বাসাবাড়িতে পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত নগরীর অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ-২-এর আওতাধীন উপশহর বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে পানি প্রবেশ করেছে। এজন্য কেন্দ্রের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঝড়ে গাছপালা পড়ে অনেক জায়গায় সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।

প্রায় দেড় দশকের মধ্যে নগরীতে এমন বন্যা দেখেননি বলে জানান সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। তিনি সমকালকে বলেন, ২০০৪ সালের পর নগরীতে এমন বন্যা দেখেননি। সব মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষ বাসাবাড়িতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সুরমা নদী পানি টানতে না পারায় নগরীর পানি নামছে না বলে জানান তিনি।

ছড়া-খাল উদ্ধার ও ড্রেন নির্মাণে অপরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, অতিবৃষ্টি হলে এমনিতেই পানি নামতে সময় লাগে। এবারে সুরমা ভরাট হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
তবে নগরীর মাছিমপুরের বয়োবৃদ্ধ আশিকুর রহমান জানালেন, ১৯৮৬ সালেও নগরীতে তিনি এমন বন্যা দেখেননি। নগরীর উপশহরের রায়হান উদ্দিন বললেন, মঙ্গলবার ভোর থেকে বাসায় পানি ঢোকা শুরু করে। আগের দিন আশপাশের রাস্তা ও নিচু জায়গায় পানি ছিল। সকালে ঘরেও কয়েক ইঞ্চি পানি উঠছে।

গতকাল সকালের পর নগরীতে ভারি বর্ষণ বন্ধ হলেও বন্যার পানি বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। নগরীর শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, তেররতন, সোবহানীঘাট, কালীঘাট, চাঁদনীঘাট, ছড়ারপাড়, শেখঘাট, তালতলা, কলাপাড়া, মজুমদারপাড়া, মাছিমপুর, আখালিয়া, নেহারিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকায় ঢুকছে পানি। বাসাবাড়ির নিচতলার আসবাবপত্র ডুবছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণ বিতরণের জন্য আজ বুধবার সিলেটে আসছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী সমকালকে বলেন, নগরীর আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে কয়েক শত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যা কবলিত এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সংগ্রহ করে বিতরণ করা হবে।

নাব্য সংকটের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের পানি সুরমা নদী ধারণ করতে পারছে না। এ ছাড়া ভারতের আসামে বন্যার পানি নেমে আসায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে সুরমা নদী খনন করা প্রয়োজন। না হলে প্রতি বছর এমন দুর্ভোগ পোহাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এই দাবি করে আসছি।

নগরীর রায়নগর, কুমারপাড়া, ধোপাদিঘিরপার, পাঠানটুলা, লন্ডনি রোড, সাগরদিঘির পাড়, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, মদিনা মার্কেট, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর রোড, মোমিনখলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব এলাকার মানুষও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে নগরবাসীকে মুক্ত করতে প্রায় ১১০০ কিলোমিটার ড্রেন সংস্কারের কাজ শুরু করেছে সিসিক। এ কাজের ৭৫ শতাংশ শেষের দাবি করেছে সিসিক।

নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছড়া-খাল উদ্ধার, গার্ডওয়াল নির্মাণ ও ড্রেন সংস্কারের জন্য সরকার ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া গত ৯ বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন ধাপে কয়েক শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
মৌসুমের শুরুতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার নগরীবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ড্রেনের ওপরের দিক বন্ধ করে বক্স নির্মাণ করছে। এতে বৃষ্টির পানি অপসারণের সুযোগ না পেয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ড্রেনের ওপর বন্ধ করতে মানা করছেন। তার পরও তারা তা করছে।

২০১২ সালে সিলেটে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সুরমা নদী খননের জন্য একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। এরপর নদী খননের জন্য সমীক্ষা চালানো হলেও প্রকল্পের বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর বিআইডব্লিউই সুরমা নদীর নৌপথ পুনরায় চালুর জন্য খননের উদ্যোগ নিলে পাউবোর প্রকল্প ফাইল চাপা পড়ে যায়।