করোনার ধকল এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের অর্থনীতি। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যয় সংকোচন নীতি নিয়েছে সরকার। উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ে লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলোর দেওয়া চাহিদার চেয়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকা কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমনকি সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক অর্থাৎ দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া প্রকল্পের বরাদ্দও চলতি অর্থবছরের তুলনায় কমানো হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পের সংখ্যা আটটি। চলমান আছে পাঁচটি। এর মধ্যে দুটির বরাদ্দ কমানো হয়েছে। একটির বরাদ্দ স্থগিত রাখা হয়েছে। সামান্য বেড়েছে একটির। তবে পদ্মা বহুমুখী রেল সংযোগ প্রকল্পের বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের তুলনায় বেশ খানিকটা বেড়েছে।

রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প :আগামী অর্থবছরের এডিপিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর ছিল ১৬ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ কমলো ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলছে, গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৪৭ শতাংশের মতো। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে।

মেট্রোরেল প্রকল্প :রাজধানীর যানজট লাঘবে নেওয়া ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে (লাইন-৬) নতুন এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বরাদ্দ কমেছে ১ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে।

দোহাজারী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ :দোহাজারী রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু মিয়ানমারের নিকটে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পটিতে নতুন করে ব্যয় না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এডিপিতে প্রকল্পটিকে তারকা চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল বাড়ানো না হলে বরাদ্দ করা অর্থও ছাড় কিংবা ব্যয় করা যাবে না। প্রকল্পটিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। আগামী মাসে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ২০১০ সালে কাজ শুরু হয়। বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৬৯ শতাংশ।
জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্য প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, সরকারের কৃচ্ছ্র নীতি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের জন্য প্রযোজ্য নয়। এ প্রকল্পগুলোর কাজ শেষের দিকে আসায় চাহিদা কমেছে। এ কারণেই বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন হয়নি। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চাহিদার ভিত্তিতেই বরাদ্দ বিবেচনা করা হয়েছে। এডিপি খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকেই বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প :মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৩৯২ কোটি টাকা বেড়েছে প্রকল্পটির বরাদ্দ। ১২টি গুচ্ছ প্রকল্পসহ ২০২৬ সালে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়নের হার ৫৬ শতাংশ।

পদ্মা বহুমুখী রেল সংযোগ প্রকল্প : নতুন এডিপিতে পদ্মা বহুমুখী রেল সংযোগ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর ছিল ৩ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫৬ শতাংশ। প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা।

ফাস্ট ট্র্যাকের অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প লাভজনক না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছে সরকার। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি এডিপিভুক্ত নয়। আর বহুল আলোচিত পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রায় শেষ। নতুন এডিপিতে এ প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।