চারদিকে ভেজাল আর ভেজাল। জল-স্থল, হাট-বাজার, গ্রামে-গঞ্জ- কোথায় নেই ভেজাল! ভেজালে নিমজ্জিত হয়ে আছে গোটা দেশ এবং আমাদের কাল। এখন সবাই যেন ভেজালাতঙ্কিত। ভেজালের ভিড়ে আসল নির্বাসিত। ঘর হতে দু'পা বাইরে যান, কিছু কিনে আনবেন বা কিছু খাবেন তো বড় বড় চোখ করে দেখছেন; কিন্তু কণ্ঠস্বরে অসহায় মৃদু আওয়াজ- আসল হবে তো ভাই? সন্দেহ যেন থেকেই যাচ্ছে। অথচ টাকা দিচ্ছেন আসল, জিনিসটা নকল। নকল বা দেখতে হুবহু একটা জিনিস হয়তো আপনাকে সরাসরি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে না বা বড় ক্ষতি করছে না। কিন্তু নকল বা ভেজাল খাবার কিন্তু কাউকে কখনও ছেড়ে যাচ্ছে না। ফরমালিন মিশ্রিত খাদ্যের মাধ্যমে নানা অনিরাময় ও অসংক্রামক রোগবালাই সন্তর্পণে আপনার মধ্যে বাসা বাঁধছে। জানা যায়, শিল্পের প্রয়োজনের চেয়ে কয়েকশ গুণ অতিরিক্ত ফরমালিন আমদানি হচ্ছে। মাছ-মাংস, ফল-জল, চাল-ডাল, পানীয়, সবজিতে নিত্য ভেজাল মিশ্রিত খাবার খেয়ে ক'দিন সুস্থ থাকা সম্ভব? এমন পরিস্থিতিতে এখানে বাহ্যিকভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেও কি আদৌ বাঁচা সম্ভব? এখানে দুর্ভাগ্য, ভেজাল খাবারের ফলে অসুস্থ হয়ে তাৎক্ষণিক উপশম পাওয়ার জন্য যে ওষুধ সেবন করবেন, তাতেও যদি ভেজাল থাকে তবে কী? আমাদের সবারই প্রশ্ন- এর প্রতিকার এবং শেষ কোথায়?

২. খাদ্যে নানা বর্ণের কৃত্রিম উপাদান ব্যবহারের ফলে দেশব্যাপী হাজারো মানুষ প্রতিনিয়ত কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশের একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে, গত ১০ বছরে ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বছরে লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে এ তিন ধরনের রোগে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভেজাল খাবারের সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি ও ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে সরাসরি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালে বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৮,৩৫০। আর একই বছর হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন ১,৮০,৪০৮ জন, যা ২০১৯-এর তুলনায় ছিল ৩১ হাজার জন বেশি। দেশে বছরে ১,৫০,০০০ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে প্রায় ১,১৫০০০। একইভাবে ২০২০ সালে কিডনি রোগে মারা যায় ২৮,০১৭ জন। পূর্ববর্তী বছরে ছিল ১০,৬২২ জন। শিশুখাদ্যের ৯৫ শতাংশই নাকি ভেজাল। বিষাক্ত ও ভেজাল খাবারের ফলে ১০ শতাংশ শিশু মৃত্যুবরণ করে। গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর ৫০ লাখ মানুষ কেবল খাদ্যের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানবদেহে এ জাতীয় অসংক্রমিত রোগ সৃষ্টির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল খাদ্য গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে।

৩. ওষুধে ভেজাল। সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং দুর্ভাগ্যজনকও বটে। ওষুধে আমাদের যথেষ্ট সুনাম আছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বড় বড় দেশে আমাদের ফার্মার তৈরি ওষুধ যাচ্ছে। মান নিয়ে কোনো বিতর্ক আসছে না। প্রায় ৫০টি দেশে তা রপ্তানি হচ্ছে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রাও আসছে। যত সমস্যা দেশে। সবাই জানে, সব ক্ষেত্রেই উৎপাদিত কোয়ালিটি পণ্য মানে বিদেশিদের জন্য, অর্থাৎ বড়দের খাবার। অন্যদিকে, ভেজাল ও নকল পণ্যগুলো পৃথক উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। যা বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি আর আমাদের স্বদেশে পড়ে থাকা সাধারণ মানুষ ক্রয়ের বিনিময়ে ভোগ করবে। ভোক্তার অধিকার এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। সুযোগে অসৎ অসাধুদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে আমাদের এ মাতৃভূমি। সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় কলামে দেখলাম, কোনো পরিচিতি নেই, প্রমাণক নেই, মান যাচাইয়ের সুযোগ নেই এমন ওষুধের উৎপাদন হচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। আর এসবের বিজ্ঞাপন প্রচারে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেউ মানছে না। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব নকল, অপ্রয়োজনীয় ও ভেজালে সয়লাব হয়ে যাওয়া ওষুধ বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে বছরে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করছে কোম্পানিগুলো।

৪. ভেজাল এখন রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সমাজে এবং তৃণমূলের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ, শিরা-উপশিরায় বিস্তৃত। ডান-বাম নির্বিশেষে দেশের সব রাজনৈতিক দলের ভেতরের দলীয় চিত্র এবং চরিত্র উভয়ই বদলে গেছে। রাজনীতিতে আদর্শিক মূল স্রোত বলে যা ছিল, তা রয়েছে অস্তিত্বের সংকটে। অন্যায়, অপরাধ ও নীতিহীনতা প্রবলভাবে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে। মাঠে-ঘাটে যাঁরা নিবেদিতপ্রাণ ও পরীক্ষিতজন ছিলেন, তাঁরা নীরবে-নিভৃতে ম্রিয়মাণ। সততা, আদর্শ ও আত্মসম্মানবোধ নিয়ে যাঁরা এতদিন আঁকড়ে ধরে ছিলেন দল ও জনতাকে, তাঁরাও পড়েছেন বিপাকে। বেঁচে আছেন অথচ কোথাও নেই। ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে দুর্বিষহ সময় যাপন করছেন। তৃণমূলের সব পদ-পদবি, সামাজিক রীতিনীতি, ছোট-বড় মর্যাদা সবকিছু রাতারাতি চলে গেছে তথাকথিত হাইব্রিড অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রণে। ভুল এবং ভেজাল নেতৃত্বের কবলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে গ্রামীণ রাজনীতি। অবস্থাটা এমন, কার কাজ কে করে? কার দলে কে নেতা? কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে? যাঁদের হাতে গ্রামীণ জনপদ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন থাকত, তাঁরা কোথায়? অদৃশ্য ছায়ায় নিভৃতেই মিলিয়ে যাচ্ছে মানুষ। যেন উড়ে এসে জুড়ে বসে গেছে সর্বগ্রাসী ভুঁইফোঁড়রা। সমাজে ভেজালরাই তাড়িয়ে দিয়েছে আসলদের। কারণ ভেজালরা ঐক্যবদ্ধ, আর খাঁটিরা নিঃসঙ্গ। তাঁদের দল সবসময় সংখ্যালঘু। অর্থনীতির চিরায়ত সূত্রের মতো- 'ব্যাড মানি ড্রাইভস গুড মানি আউট অব সার্কুলেশন'। মাঝেমধ্যে দলগুলোর আহাজারি ও রোদনভরা আর্তি শোনা যায়- অনুপ্রবেশকারীরা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। এদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এতে ভেজাল মানুষদের একতা আরও সুদৃঢ় হয়। তারা নানা কলাকৌশলে কেন্দ্র-প্রান্ত সংযোগ স্থাপন করে অধিকতর আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এতে বারবার ভেস্তে যায় শুদ্ধাচার অভিযানের ঘণ্টাধ্বনি। আরও হতাশায় পড়ে সৎ, দেশপ্রেমিক ও বিবেকবানরা। হঠাৎ ভাবলে চমকে উঠি- এত ভেজাল ও অধঃপতিত মানুষ নিয়ে কি ৫০ বছর আগে এ দেশ স্বাধীন করা সম্ভব ছিল? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো বাঙালির ভূমিপুত্র ও মা-মাটি-মানুষের অবিসংবাদিত নেতার পক্ষেও কি এটা সম্ভব হতো? আজকের এমন নির্লজ্জ সুবিধাবাদীদের সঙ্গে নিয়ে কোটি কোটি মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো কি সহজ হতো? সর্বত্র নীতি-আদর্শ বিসর্জনকারীদের দিয়ে কি প্রকৃতার্থে জনসেবা বাস্তবায়ন করা সম্ভব?

৫. দেশে ভেজাল ডিগ্রি, ডাক্তার, উকিল, ম্যাজিস্ট্রেট, মেজর আরও কতকিছু প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের মোকাবিলা করতে হয়! কী বিচিত্র এই দেশ! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রিতে ভেজাল, গবেষণায় অন্যের কপি-পেস্ট। সরাসরি নকলের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তোলপাড় ক্যাম্পাস, সর্বত্র মুখরোচক গল্পগাথা। ভর দুপুরে আদালতপাড়ায় কালো গাউন পরিহিত ত্রস্ত-ব্যস্ত সবাই হয়তো প্রকৃত অ্যাডভোকেট নন। চেম্বার নিয়ে দিব্যি প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন দেশে এমন ভুয়া ডাক্তারের সঠিক সংখ্যাও নিরূপণযোগ্য নয়। ভেজালে ভরা দেশে পুলিশ অফিসারের কৃত্রিম পরিচয় দিয়ে লুট করে নিচ্ছে মানুষের সল্ফ্ভ্রম ও অর্থ। পত্রিকার পাতাজুড়ে সচিত্র ভুয়া মেজর প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার নামে দখল করে নিচ্ছে সাধারণের ভূমি। ম্যাজিস্ট্রেট সেজে প্রতারণামূলক মোবাইল কোর্ট বসিয়ে হয়রানি করছে সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাকে। কী আশ্চর্য! কিছুদিনের জন্য সবকিছুই এখানে করা সম্ভব হয়ে ওঠে। কেউ কেউ হয়তো ধরা না পড়ে অনায়াসে জীবনের প্রান্তে উপনীত হয়ে বেঁচে যাচ্ছে। দেশে এমন ভেজাল মানুষের সংখ্যা নগণ্য হওয়ার কারণ নেই।

৬. যে দেশে মধু এবং বিষ উভয়ই ভেজালের কবলে। বাজারে যান, মধু ক্রয় করুন; দেখবেন মধুর পাত্রের চারদিকে মৌচাকের ওপর জীবন্ত মৌমাছির ওড়াউড়ি। কী লোভনীয় চিত্তাকর্ষক দৃশ্য! সন্দেহের অবকাশ কোথায়? সাক্ষী আছে চোখের সামনে। কিন্তু না, বাড়িতে গিয়ে অন্যরকম চিত্র। রং এবং গাঢ়তায় সামান্য ভেজাল মনে হয়, তবে যাই হোক ... আর কী করার আছে। মধুময় হয়ে উঠল না পরিবেশটা। তেলাপোকা, ছারপোকা, ইঁদুর ইত্যাদিতে জীবন বিষিয়ে গেছে তো, এদের হত্যা করা অনিবার্য। বিজ্ঞাপনে চোখ রেখে বাজার থেকে নিয়ে আসুন বিষের খাবার। মনে হবে এগুলো আসলে এদের খাবারই। খাওয়ার পরে সামান্য একটু মাতাল হয়ে ঘুরবে, এ-ই যা। যেমন, 'নেশার লাটিম ঝিম ধরেছে...।' তবে দুপুরের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। কাজ তো হলো না, বরং এদের জীবনও একটু বৈচিত্র্য পেল। এদের জন্য ভেজালই আশীর্বাদ।

৭. ভেজাল বিশ্বব্যাপী। ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষের এই পৃথিবী। আজকাল উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারকারী পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও নানা বিষয়ে বিতর্ক হচ্ছে। গণতন্ত্র ও ভোটের রাজনীতি নিয়ে অভিযোগ উঠছে। নির্বাচনে কারচুপির কথা তারাও বলছে। পুঁজিবাদী আগ্রাসন অনবরত হুমকি দিচ্ছে ছোটদের। যুদ্ধ-বিগ্রহ চলমান; ভবিষ্যতেও থাকবে। আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যবসার নাম নাকি অস্ত্র ব্যবসা। তবুও সান্ত্বনা খুঁজে পাই, তারা দিবানিশি যা খাচ্ছে এবং খাওয়াচ্ছে, যা পান করছে বা আপ্যায়ন করছে এমন মুখের গ্রাসকে বিষাক্ত করে দিচ্ছে না। তারা অন্তত এ জায়গাটা ভেজালমুক্ত করে রাখছে। মানুষের জীবনই প্রকৃতির মহামূল্যবান উপহার। সবার ওপরে জীবন সত্য।

হোসেন আবদুল মান্নান: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক