কয়েকদিন ধরে সিলেটে বৃষ্টিপাত কমলেও নদনদীর পানি বাড়ছে; বন্যা পরিস্থিতিরও অবনতি হচ্ছে। ২০০৪ সালে সর্বশেষ সিলেটে বড় ধরনের বন্যা হলেও তখন নগরীতে ক্ষয়ক্ষতি কম ছিল। এবারের চলমান দুর্যোগকে ১৯৮৬ সালের চেয়েও ব্যাপক বলে কেউ কেউ মনে করছেন। নগরীতে এমন বন্যা আগে দেখা যায়নি। এবারের নজিরবিহীন বন্যা ও জলাবদ্ধতার জন্য সুরমা নদীর নাব্য সংকট দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।

নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) কয়েক বছর ধরে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও এবারে তার সুফল পাননি নাগরিকরা। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও সিসিকের প্রকৌশলীরা নগরীতে বন্যার জন্য সুরমা নদীর নাব্য সংকটকে চিহ্নিত করেছেন। তবে অপরিকল্পিতভাবে ছড়া-খাল উদ্ধার, ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারের ফলে সুরমার পানি নগরের বিভিন্ন এলাকা ভাসিয়েছে বলে পরিবেশবিদরা মনে করছেন। সিসিকের একজন প্রকৌশলীও তা স্বীকার করে বলেছেন, সুরমা নদীর পানি ছড়া-খাল হয়ে নগরীর বিপুল এলাকা তলিয়েছে।
নগরীর পাশাপাশি সদর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি। এবারে উপজেলা পর্যায়ে বন্যার ভয়াবহতার জন্য জলাধারসহ নিম্নাঞ্চল ভরাট, হাওরে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত করাকে দায়ী করছেন সংশ্নিষ্টরা। এসব বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ না দিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করছেন পরিবেশবিদরা। বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও পরিবেশবিদদের সুরেই দ্রুততার সঙ্গে সুরমা নদী খননের কথা বলেছেন। এবারের বন্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা সুরমা খননের দাবি করে আসছেন। সিলেটে ভয়াবহ বন্যার পানি জমে থাকার বিষয়টি তাঁকেও ভাবাচ্ছে।
২০০৪ সালের পর এবার উজান থেকে সবচেয়ে বেশি পাহাড়ি ঢল নেমে আসছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে। ঢল ও ভারি বর্ষণে সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ বন্যায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। শুধু নগরীতেই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি।
স্বাভাবিক প্রবাহের ধর্ম অনুযায়ী পাহাড়ি ঢলের শেষ গন্তব্য সিলেট-সুনামগঞ্জের হাওর হলেও সেগুলো এখনও পুরোপুরি পানিতে পূূর্ণ হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বন্যার পানি বিস্ময়করভাবে ভাটির দিকে না নেমে থমকে রয়েছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও স্থানীয় কৃষক সেলিম আকঞ্জি বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছরেও হাওরে এ সময়ে এত পানি তিনি দেখেননি। তবে সিলেট নগর বা সুনামগঞ্জ শহরের বন্যার সঙ্গে তুলনা করলে হাওরে পানি এখনও কম বলে জানান তিনি।

এই মৌসুমে সবসময় ঢল নামে উল্লেখ করে এবারের বন্যার ধরন নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের মনেও প্রশ্ন জেগেছে। মন্ত্রী বলেন, তার ছেলেবেলায় কিন্তু পানি আটকে থাকত না, চলে যেত। কারণ তখন শহরে অনেক পুকুর ও দিঘি ছিল। প্রত্যেক বাড়ির সামনে পুকুর ছিল। আর সিলেটকে বলা হতো দিঘির শহর। কিন্তু এখন নগরের ভেতরের সব পুকুর-দিঘি ভরাট করে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি করা হয়েছে। হাওরগুলো ভরাট করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। খালি মাঠগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে পানি নামতে পারছে না। এটা সিলেটের জন্য ভয়ের কারণ।
চলতি মৌসুমের শুরুতে সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা ঘটে। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি নদীগুলোর নাব্য সংকটের বিষয় আলোচনায় আসে। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় নদীগুলো নাব্য হারিয়েছে। এতে শুস্ক মৌসুমে নদীগুলো যেমন স্রোতহীন হয়ে পড়ে, তেমনি বর্ষায় অল্প বৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করছে। ফলে চাপ পড়ছে হাওরসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চলে।

সাম্প্রতিক সময়ে হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসলহানির জন্য নদীর নাব্য হারানো বড় কারণ বলে জানিয়েছেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা। তিনি বলেন, নদী বাড়তি পানি ধরে রাখতে পারে না বলে অল্পতেই হাওরে চাপ পড়ে। তাই কার্যকরভাবে নদী খনন করতে হবে। দরকার পূর্ণাঙ্গ খনন বা ক্যাপিটাল ড্রেজিং। তিনি বলেন, সীমান্তের ওপারে বরাক থেকে শুরু করে সুরমা-কুশিয়ারাসহ মেঘনা অববাহিকা পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নদী খনন করতে হবে। এই অববাহিকায় ভৈরব নদীতে বেশ কয়েক জায়গায় চর জেগেছে। তাই শুধু সুরমা বা কুশিয়ারা খনন করলে হবে না, পুরো অববাহিকার নদী খনন করতে হবে।

বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম মনে করেন, আগামী শুস্ক মৌসুমে নদী খননের জন্য এখন থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, নদী খননের কথা বললে পাউবো ব্যাপক উৎসাহে প্রকল্প নেয়। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাশিত কাজ হয় না। দুর্নীতিমুক্ত কাজের জন্য নাগরিক তদারকি কমিটি করা যেতে পারে।
সেইভ দ্য হ্যারিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের সভাপতি আব্দুল হাই আল-হাদী বলেন, এই অঞ্চলের নদীগুলোর চরিত্র অনন্য। এখানের সবক'টি পার্বত্য নদী। তাই সীমান্তের ওপার থেকে পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু ও পলি নিয়ে আসে। ফলে খুব দ্রুত নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্য সংকট দেখা দেয়। তাই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধারাবাহিকভাবে নদীগুলো খনন করতে হবে। তিনি বলেন, পাউবো বিচ্ছিন্নভাবে নদী খনন করলে তাতে কোনো কাজ হবে না। এজন্য প্লাবন ভূমিসহ নদী চিহ্নিত করে খনন করতে হবে।
২০১২ সালে পাউবো সুরমা নদী খননের জন্য একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সুরমা নদীর নৌপথ পুনরায় চালুর জন্য খননের উদ্যোগ নিলে পাউবোর সেই প্রকল্প ফাইল চাপা পড়ে যায়। একপর্যায়ে বিআইডব্লিউটিসির উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়ে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মূল ভারতের বরাক হওয়ায় দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয় রয়েছে বলে জানান পাউবোর কর্মকর্তারা। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জের অমলসিদে নদী মোহনার বিশাল চর নো-ম্যানস ল্যান্ডে হওয়ায় দুই দেশের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
এখন আবার নদী খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান সিলেটে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, নদী খননের বিকল্প নেই। এ অঞ্চলের নদীগুলো খননের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এবং সেন্টার ফল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওলজিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস কাজ শুরু করেছে। তাদের সমীক্ষার পর নদী খননের প্রকল্প নেওয়া হবে।