সাধারণ জ্ঞানবিষয়ক বইগুলোতে একটি প্রশ্ন দেখা যায়- 'বাংলাদেশে কোন কোন জেলায় রেলপথ নেই?' তার উত্তরে একাধিক জেলার নাম চলে আসে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, 'বাংলাদেশের পুরোনো কোন জেলায় (১৯৮৪ সালের আগ পর্যন্ত জেলার সংখ্যা ছিল ১৯টি) সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই?' তাহলে সঠিক উত্তরে একটি জেলার নামই চলে আসবে। সেটি হলো- 'বগুড়া'। বগুড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় কষ্ট নিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বগুড়ার প্রবীণ সাংবাদিক মুরশিদ আলম। প্রেস কাউন্সিল পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক মুরশিদ আলমের মতে দুইশ বছরের পুরোনো একটি জেলা শহরে এতদিনেও সরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কেন নির্মাণ করা হয়নি, তা আমাদেরও ভাবায়। এটাকে বগুড়ার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বললেও হয়তো কমই বলা হবে।

বগুড়ায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। এ জন্য বিভিন্ন সময় স্থানীয়ভাবে অনেক আন্দোলনও হয়েছে। ওইসব আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের একজন হাছানাত আলী, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি বলেন, 'আমরা যখন আন্দোলন করছিলাম তখন ভাবতাম, হয়তো আমরা পড়তে পারব না কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েরা নিজ জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু তারাও সেই সুযোগ পেল না। এখন আমাদের নাতি-নাতনিরা সেই সুযোগ পাবে কিনা সেটাও বলা যাচ্ছে না।'

বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারিভাবে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর। এ জন্য ২০০১ সালের ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে 'বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন' পাস করা হয়। পরে সেই আইনটি গেজেটভুক্তও করা হয়। কিন্তু ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বগুড়ায় আর্মি মেডিকেল কলেজের ভিত্তি স্থ্থাপন অনুষ্ঠানে এ জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তার সদিচ্ছার কথা জানান। একই বছরের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় ধরনের ৮টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তার প্রায় দেড় বছরের মাথায় ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জেলার সান্তাহারে আওয়ামী লীগের অপর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি এ ব্যাপারে আইন তৈরির জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) নির্দেশ দেওয়া হয়। তার দেড় বছরের মাথায় ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে 'বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন'-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর সোয়া দুই বছর কেটে গেলেও বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে আর কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এমনকি এ ব্যাপারে বগুড়া জেলা প্রশাসন ও শাসক দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দও নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারেননি।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বগুড়ার সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাছুদার রহমান হেলাল জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, প্রায় দেড় দশক ধরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় বগুড়ার শিক্ষার্থীরা রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। তিনি গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া বগুড়ার শিক্ষার্থী মেফতাউল আলম সিয়মের উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'তার মতো অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বগুড়ায় রয়েছেন। কিন্তু সবার পক্ষে জেলার বাইরে গিয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। বগুড়ায় যদি বিশ্ববিদ্যালয় থাকত তাহলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাও সেখানে পড়ার সুযোগ পেতেন।'

সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, 'বগুড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি- এটা কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।'

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সামস-উল আলম বলেন, জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর গড়ে ২০ হাজার শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করেন। তার মধ্যে স্থানীয় তিনটি সরকারি কলেজে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী অনার্সে পড়ার সুযোগ পান। তাহলে বাকি শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবেন?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি থাকার পরও বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু না হওয়ায় শাসক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দও হতাশ। এ প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক সুলতান মাহমুদ খান রনি সমকালকে বলেন, 'বগুড়ার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আটকে আছে, তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ অন্যতম। আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়টি হলে বগুড়ার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। আমরা এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ করব।'
বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক জানান, 'বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন'-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যায়। তিনি বলেন, 'যতদূর জানি করোনা পরিস্থিতির কারণে এতদিন সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটি হয়তো এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আমরা আশাবাদী।'