বগুড়া শহরের প্রধান সমস্যা কী? এক দশক আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই প্রশ্ন করলে উত্তর আসত একাধিক। কিন্তু এখন সবার উত্তর- যানজটই বগুড়া শহরের এক নম্বর সমস্যা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি জেলা ও পুলিশ প্রশাসন এবং পৌর কর্তৃপক্ষও শহরের যানজট সমস্যার কথা স্বীকার করে। সব পক্ষই মনে করে, যানজটের জন্য প্রধানত শহরের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া রেলপথই দায়ী।

পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রেলপথ শহরের বাইরে স্থানান্তর না করে যত ধরনের পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, যানজট দূর করতে তা কোনো কাজেই আসবে না। বগুড়া শহরটিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই অংশে ভাগ করেছে রেলপথ। বিসিক শিল্পনগরী ও ব্যাংক-বীমাসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগের কার্যালয় রয়েছে শহরের উত্তর অংশে। আবার সরকারি অফিস-আদালত এবং অনেক স্কুল ও কলেজ পড়েছে দক্ষিণ অংশে। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারের অবস্থান উত্তরে হলেও খুচরা বড় বাজার পড়েছে দক্ষিণ অংশে। যে কারণে বগুড়া শহরে বসবাসরত প্রায় ৭ লাখ মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনে প্রতিদিন শহরের দুই অংশেই যাতায়াত করতে হয়।

দেড় দশক আগে বগুড়া শহরের মূল অংশে রেলওয়ের তিনটি লেভেল ক্রসিং ছিল। তবে ২০০৬ সালে পৌরসভার আয়তন পাঁচগুণ বাড়িয়ে ৭০ বর্গকিলোমিটার করার পর নতুন করে আরও ৪টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করতে হয়েছে। তাছাড়া শহরের মূল অংশের বাইরে ছিল এমন দুটি লেভেল ক্রসিং (কামারগাড়ি এবং তিনমাথা রেলগেট) এখন প্রধান সড়কের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। ট্রেন চলাচলের সময়ে ওই ৯টি লেভেল ক্রসিংয়ের গেট (লোহার বার) বন্ধ করে দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় আন্তঃনগর ও লোকালসহ ১৪টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে সকাল পৌনে ৮টা থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টায় ১০টি ট্রেন চলাচল করে। আর অফিস ও স্কুল টাইম অর্থাৎ সকাল সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ১১টার ভেতর চলাচল করে ৪টি ট্রেন।

মাত্র সোয়া দুই ঘণ্টায় চারটি ট্রেনের চলাচলে সড়কগুলোতে থেমে থাকা যানবাহনের সারি এতটাই দীর্ঘ হয় যে, একটি ট্রেন লেভেল ক্রসিংগুলো অতিক্রম করার পর আরেকটি ট্রেন চলে আসার সময় হয়ে যায়। ফলে আবারও সড়কগুলোতে আটকে পড়ে যানবাহন।

বগুড়া শহরের শিববাটি এলাকার বাসিন্দা আফসানা খাতুন জানান, তার মেয়ে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দিবা শাখার ছাত্রী। সাড়ে ১১টা থেকে তার ক্লাস। তিনি বলেন, '১১টার পরপরই একটি ট্রেন আসে। তখন লেভেল ক্রসিংয়ের গেট বন্ধ করা হয়। এতে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। সেই যানজটে যাতে না পড়তে হয় সেজন্য প্রতিদিন আমাকে ক্লাস শুরুর পৌনে এক ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বের হতে হয়।'

বগুড়া শহরের বড়গোলা এলাকায় একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তনিমা নাহিদ সঞ্চিতা জানান, শহরের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ট্রেনের কারণে দীর্ঘসময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। এ কারণে নির্ধারিত সময় সকাল ৯টায় অফিসে পৌঁছানো যেমন কষ্ট হয়, তেমনি অফিসের কাজে বের হলেও ভোগান্তি পোহাতে হয়।

বগুড়া পৌরসভার শহর পরিকল্পনাবিদ আল-মেহেদী হাসান জানান, শহরে এমনিতেই যানবাহন বিশেষত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বেশি। ট্রেন চলাচলের আগে ও পরে সেগুলো থমকে যায়। যদি রেলপথকে শহরের বাইরে স্থানান্তর করা যায়, তাহলে যানজট অনেকটাই নিরসন হবে।

একই মত দিয়েছেন বগুড়া পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক (প্রশাসন) রফিকুল ইসলামও। তিনি বলেন, প্রতিবার ট্রেন চলাচলের কারণে ৩০ মিনিট করে দিনের অন্তত আড়াই ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকে। এ কারণে পুরো শহরে যানজট ছড়িয়ে পড়ে।

রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে শহরের সড়কগুলো সম্প্রসারণের সময় রেলপথ স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তখন বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনকে শহর থেকে ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে শহরদীঘি এলাকায় সরিয়ে মাটিডালি হয়ে পূর্বে গাবতলী রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত নতুন রেলপথ স্থাপনের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আর হয়নি।

বগুড়া-৬ (সদর) আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ জানান, তখনকার সেই উদ্যোগ যদি বাস্তবায়ন হতো, তাহলে যানজটের কারণে আজ বগুড়া শহরে স্থবিরতা নেমে আসতো না। যানজট নিরসনের জন্য বগুড়া শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা রেলপথকে বাইরে স্থানান্তরের জন্য সংসদে দু'বার সরকারের মনোযোগ আকর্ষণী নোটিশ দিয়েছি।

গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নে আলোচনার জন্য রেলমন্ত্রী চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ঢাকায় দুই জেলার সব জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা ডেকেছিলেন। সেখানেও আমি রেলপথকে বগুড়া শহরের বাইরে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছি। আমি বলেছি, যেহেতু বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য শহরের বাইরে নতুন রেলপথ নির্মাণ এবং একটি নতুন স্টেশন নির্মাণ করতে হচ্ছে তাই রেলপথকে শহরের বাইরে স্থানান্তরের এখনই উপযুক্ত সময়। তা না হলে আগামীতে বগুড়া শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

বগুড়া সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাছুদার রহমান হেলাল বলেন, 'শহরকে যানজটের হাত থেকে বাঁচাতে হলে রেলপথকে শহরের বাইরে স্থানান্তর করার কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি রিকশা চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।'

যানজট নিরসনে বগুড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালাহ্‌উদ্দিন আহমেদ জানান, খুব শিগগির তারা একটি সভা আহ্বান করবেন এবং সেখানে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতেই যানজট নিরসনে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

তবে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, বগুড়া শহরে যানজট নিরসনে লেভেল ক্রসিং এলাকায় ওভারপাস কিংবা আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা এ ব্যাপারে খুব শিগগির উদ্যোগ নেব।'