দেশে রাজনৈতিক দলগুলো যেমন সাংগঠনিক নিয়ম-শৃঙ্খলা কমই মানে, সে ধারায় ৯ বছর পর বগুড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হতে যাচ্ছে আগামীকাল ২৪ মে। তবু অধিকাংশ পদে পুরোনোরাই থাকবেন বা থাকার চেষ্টা করছেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। এর একটি কৌশল হিসেবে নিম্নতর স্তরে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিগুলোর সম্মেলন আগে হওয়ার বিধান উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি উপজেলা সম্মেলন করা হচ্ছে। এতে তৃণমূলের কর্মীরা ক্ষোভ ঝরাচ্ছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পূর্ববর্তী শেষ সম্মেলনটি হয়েছিল। তখন পাল্টাপাল্টি দুটি সম্মেলন হয় একই দিনে। একটি সদরের শাখারিয়ার পল্লীমঙ্গল হাটে, অন্যটি মাটিডালী বিমান মোড়ে। পাল্টা কমিটিও দুটি ঘোষণা হয়। শাখারিয়ার সম্মেলনে সভাপতি হন আবু সুফিয়ান শফিক ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম রাজ। বিমান মোড়ের সম্মেলনে কমিটির সভাপতি হন সহিদুল ইসলাম দুলু ও সাধারণ সম্পাদক কাওসার আলী খোকন। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মমতাজউদ্দিনের আনুকূল্য পাওয়া সফিক-রাজের কমিটি টিকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়েও দলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলন ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেদিনের ওই সম্মেলন।

এরপর ২০০৪ সালের জুলাই মাসে উপজেলা কমিটির সম্মেলন হয়েছিল নিয়মমাফিকভাবেই। তখন ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলন শেষে উপজেলা সম্মেলন হয়। শহীদ টিটু মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হায়দার আলী সভাপতি ও অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানী খান রোমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটে হেরে যান সভাপতি পদে সহিদুল ইসলাম দুলু ও সাধারণ সম্পাদক পদে আবু সুফিয়ান সফিক।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে হায়দার আলী ও গোলাম রব্বানী খান রোমানকে একঘরে করে ফেলেন মমতাজ অনুসারীরা। মমতাজউদ্দিনের মামাতো ভাই আবু সুফিয়ান সফিক ও ফুফাতো ভাই মাফুজুল ইসলাম রাজ হাত মেলান। আবার অনিয়ম। ২০১৩ সালে সম্মেলনের আগে কমিটি বিলুপ্তির বিধান না থাকলেও কমিটি বিলুপ্ত করে সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় আবু সুফিয়ান সফিককে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় মাফুজুল ইসলাম রাজ ও ফোরকান হামিদকে। তাঁরা ওয়ার্ড কমিটি করতে গেলে সংঘর্ষ বেধে যায় গোলাম রব্বানী খান রোমান ও সহিদুল ইসলাম দুলু গ্রুপের সঙ্গে। ফলে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলন ছাড়াই নামকাওয়াস্তে তাঁরা উপজেলা সম্মেলন করেন বলে দলের ভেতর থেকেই অভিযোগ পাওয়া যায়।

আরও অভিযোগ, একপর্যায়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দ ৩০ মার্চ সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেন। কিন্তু তাঁরা সম্মেলন করতে ব্যর্থ হলে তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। পরে ২৪ মে করা হয় নতুন তারিখ। তাতেও তাঁরা ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন সম্মেলন করতে ব্যর্থ হন। সাড়ে তিন মাসে মাত্র পাঁচটি ওয়ার্ড ও তিনটি ইউনিয়নের সম্মেলন হয়। আগামীকালের উপজেলা সম্মেলনে আয়োজকরা যে কোনো মূল্যে পুনরায় নির্বাচিত হতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছেন বলে দলীয় কর্মীরা অভিযোগ করেন। সম্মেলন ঠেকানোর জন্য ঊর্ধ্বতন নেতাদের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ সহিদুল ইসলাম দুলু। তিনি উপজেলা সম্মেলনে সভাপতি প্রার্থী হবেন। তিনি দলের রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনের কাছে ১২ মে দেওয়া অভিযোগে বলেছেন, প্রথম ১৫ ফেব্রুয়ারি ও দ্বিতীয়বার ৩০ মার্চ সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করার পর ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটির সম্মেলন করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও করা হয়নি। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও ৯৯টি ওয়ার্ড সম্মেলন শেষ করে সম্মেলন করলে প্রাণবন্ত ও আরও গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের সম্মেলন করেই তড়িঘড়ি উপজেলা সম্মেলনের তারিখ দেওয়া হয়েছে নেতৃত্ব কুক্ষিগত রাখার জন্য।

জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কামরুল হুদা উজ্জ্বল এই প্রতিবেদককে বলেন, সদর উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি ও সম্পাদক সংগঠনের কোনো নিয়মনীতি না মেনেই এই সম্মেলনের আয়োজন করছেন। তাঁরা ঘরে বসেই কমিটি গঠন করে থাকেন নিজস্ব লোকদের দিয়ে।

সম্মেলনের স্থান নিয়েও অভিযোগ। পল্লীমঙ্গল প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সম্মেলনের জন্য দু'দিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে স্কুলটি। এতে এলাকায় সমালোচনা হচ্ছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সুফিয়ান সফিক অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, মাঠ পর্যায়ে সম্মেলন যেগুলো বাকি আছে, সেগুলো উপজেলা সম্মেলনের পরে করা হবে। তিনি আরও বলেন, 'দলের নেতাকর্মীরা চাইলে আবারও সভাপতি হতে পারি।'

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু বলেন, 'সম্মেলনের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা তা খতিয়ে দেখব। কিন্তু ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের সম্মেলন না হলে উপজেলা সম্মেলন হবে না- এমন বিধান নেই।'

রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, রাজশাহী বিভাগের অনেক জেলাতেই মাঠ পর্যায়ে সম্মেলন শেষ করা যায়নি। তবুও দলের প্রয়োজনে জেলা-উপজেলা সম্মেলন করা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, মাঠ পর্যায়ে সম্মেলন হলে দলের নেতাকর্মীরা আরও চাঙ্গা হয়, দলের গতিশীলতা বাড়ে। মাঠ পর্যায়ে সম্মেলন এখনও অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, সম্মেলনে অনিয়ম হয়ে থাকলে সে বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।