রাজধানীর মিরপুরের সুমন নামে এক ব্যক্তি একটি প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের কাজ করতেন। প্রায় ১২ বছর আগে তিনি কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে মিরপুর ১১ নম্বরে কাঁচাবাজার এলাকায় তিন তাসের জুয়ার আসরে বসে একশ টাকা হেরে যান। তার কাছে নগদ টাকা না থাকায় জুয়াড়িরা তার মোবাইল ফোনটি জোরপূর্বক রেখে দেয়।

বাসায় ফিরলে মোবাইল ফোনের বিষয়ে বাবাকে কী জবাব দেবে? জুয়ার কথা বললে বাবা বকাঝকা করতে পারে-এমন আশঙ্কায় তিনি বাসায় না ফিরে অজানার উদ্দেশে রওনা দেন। তখন তার বয়স ১৬ বছর। রাতে থাকেন গুলিস্তানে। পরে নানা জায়গায়। তবে রাজধানী ঢাকা ছাড়েননি, বাবা-মায়ের কাছেও ফিরে যাননি।

এরইমধ্যে সন্তান হারিয়ে গাড়িচালক বাবা মোজাফফর হোসেন প্রথমে পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে অপহরণ মামলা করেন। দুইজন গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছেন। প্রায় ১২ বছর পর কদমতলীর মদিনাবাগে সুমনের সন্ধান পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। গত সোমবার পিবিআইয়ের ঢাকা মহানগর উত্তরের একটি টিম তাকে উদ্ধার করে। মঙ্গলবার মিরপুর ৬০ ফিটে পিবিআইয়ের ঢাকা উত্তরের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

পিবিআই সুমনকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। এক যুগ পর সন্তানকে কাছে পেয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন বাবা-মা। বাবা মোজাফফর বলেন, 'আমার বিশ্বাস ছিল আমার ছেলে বেঁচে থাকলে তাকে ফিরে পাবোই। আমার মোবাইল নম্বরটি মুখস্ত ছিল তার। তাই সেই ফোন নম্বর কখনও বন্ধ করেনি। এতো বছর পর ছেলেকে ফিরে পেয়েছি, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।'

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের ঢাকা মহানগর উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সুমন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তাকে কেউ অপহরণ করেনি। জুয়ার আসরে মোবাইল ফোন খুঁইয়ে তিনি নিজেই নিখোঁজ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বাসায় ফেরার ইচ্ছা জাগলেও নানা সংশয়ে তিনি বাসায় ফেরেননি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেছেন। এরইমধ্যে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সুমন বাবা-মায়ের সঙ্গে পল্লবী এলাকায় থাকতেন। তিনি মিরপুরে শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পরবর্তীতে মিরপুরের একটি প্যাকেজিংয়ে হেলপারের কাজ নেন। ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে জুয়ায় মোবাইল ফোন খুইয়ে চলে যান। তার বাবা মোজাফফর হোসেন ছেলের সন্ধান না পেয়ে নিখোঁজ জিডি করেন। পরে অপহরণ মামলা করা হয়।

মামলা থানা থেকে ডিবিতে যায়, তদন্তের জন্য। ডিবি পুলিশ সুমনের সেই মোবাইল ফোনটি উদ্ধার এবং দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে সুমনের বিষয়ে কোনো তথ্য পাননি তদন্ত সংশ্নিষ্টরা। তারা কিছু দিন জেল খেটে জামিনে বের হন। পরবর্তীতে মামলাটি পুলিশের তদন্ত বিভাগ-সিআইডির কাছে স্থানান্তর করা হয়।

সিআইডি তদন্ত শেষে সুমনকে উদ্ধার করতে না পেরে ২০১৩ সালে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিদেন দাখিল করে। বাদীপক্ষের নারাজিতে মামলাটি পুনরায় ডিবিতে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। ২০১৯ সালে ডিবি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন আদালতে। এবারও নারাজি বাদীপক্ষের।

আদালত থেকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। পিবিআই ঢাকা উত্তরের পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম তদন্ত শুরু করেন। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে ৯ মার্চ তিনি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তাতে বলা হয়, ভুক্তভোগীকে উদ্ধার সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা সূত্র পাওয়া গেলে মামলাটি পরবর্তীতে পুনরুজ্জীবিত করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সুমন বিয়ে করে কদমতলীর মদিনাবাগে বসবাস করছিলেন। গেল ঈদুল ফিতরের দিন সুমনের বাল্যকালের বন্ধু ও চাচাত ভাই সাগরের কথা খুব মনে পড়ে তার। এর পর স্ত্রী জোসনাকে দিয়ে তার বাবার কাছে ফোন করান। জোসনা নিজের নাম গোপন করে শ্বশুর মোজাফফরকে বলেন, সুমন কোথায় আছে তা জানেন তিনি। সাগরের নম্বর চেয়েছেন সুমন। মোজাফফর ফোন নম্বর না দিয়ে পিবিআইয়ে যোগাযোগ করেন। বাবার ফোন নম্বর মুখস্থ ছিল সুমনের।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ওই ফোন নম্বরের সূত্র ধরে সুমনের সন্ধান পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়ার পর সুমন বলেছেন, তিনি চলে যাওয়ার কয়েক বছর পর বাসায় ফেরার ইচ্ছা হয়েছিল তার। কিন্তু ভেবেছিলেন এত বছর পর বাসায় গিয়ে বাবা-মাকে কী জবাব দেবেন-এ নিয়ে সংশয়ে থাকতেন। সংশয় ও ভয়ের কারণে তিনি বাসায় ফেরেননি। তবে যখন বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ত তখন পল্লবীর বাসার আশপাশে গিয়ে ঘুরে আসতেন। অবশ্য সুমন নিখোঁজ হওয়ার আড়াই মাস পরই তার বাবা-মা পল্লবী ছেড়ে নারায়গঞ্জের পঞ্চবটি এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। এ তথ্য জানতেন না সুমন।

সুমন বাসা ছেড়ে যাওয়ার পর প্রথম রাত কাটান গুলিস্তানে ঘুরাঘুরি করে। এরপর কখনও বায়তুল মোকাররম মসজিদের বারাস্তায় কখনও ফুটপাতে ছিলেন। কখনও শাহবাগে ফুলের মার্কেটে কাজ, বাসের হেলপার, হোটলের বাবুর্চি, চটপটি ও পপকর্ণ বিক্রি করেন। সর্বশেষ বাসের চালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিন বছর আগে জোসনা নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। তার এক ছেলেসন্তান হয়েছে। বয়স তিন মাস।