জরাজীর্ণ ছোট্ট খুপরি ঘর। মাথার ওপর খটখট করে ঘুরছে পুরোনো একটি সিলিং ফ্যান। বাসার পরিবেশই বলছে- টানাপোড়েনের সংসার। এ সংসারেরই শাহিন ও বর্ষা আক্তার দম্পতির একমাত্র মেয়ে শারমিন। বয়স ১ বছর ১১ মাস। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন নিজেদের আঙিনা আনন্দে মাতিয়ে রাখত সে। মিষ্টি কণ্ঠে টুকটাক কথা বলতেও শিখে গেছে। গতকাল সকালেও মা ও চাচির কাছে আবদার করে- ডিম ভাজা খাওয়ার। কড়াইতে ডিম দিতে দিতে ঘর থেকে গুটিগুটি পায়ে সামনের সড়কে চলে যায় শিশুটি। তখনই একটি মিনি ট্রাক শিশুটিকে সড়কে চাপা দেয়। চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে নিভে যায় শারমিনের প্রাণ। শিশুটিকে ঘরে না দেখে মাও দৌড়ে রাস্তায় আসেন। এরপর দেখেন, ট্রাকের চাকার নিচে পড়ে আছে তাঁর স্নেহের একমাত্র ধন। মা তাঁর সন্তানের পিষ্ট দেহ চাকার নিচে থেকে বের করেন। সন্তানের এমন পরিণতি দেখে রাস্তায় মূর্ছা যান মা। এমন মর্মন্তুদ ঘটনার পর শোকের ছায়া নেমে আসে রাজধানী তেজগাঁওয়ের ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায়।
শিশুটির বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বর্ষার মাথায় পানি ঢালছেন প্রতিবেশীরা। কেউ কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বর্ষা বিলাপ করে বলছিলেন, 'কেন আমার মানিককে কেড়ে নেওয়া হলো! কাকে নিয়ে আমি বাঁচব! কী সর্বনাশ করল আমাদের। কে আমার কাছে আবদার করবে। আমার আর কেউ রইল না।'

পাশেই বুকফাটা আহাজারি করছিলেন শিশুটির চাচি আকলিমা বেগম। তিনি বলছিলেন, 'ও আমাকে বড় মা ও জেঠি বলে ডাকত। ঘটনার আগেও শারমিন ওর মাকে আর আমাকে বলছিল, ডিম ভাজা খাবে। তার কিছু সময় আগে ওকে শাক দিয়ে ভাত খাওয়ানো হয়। এরপর মেয়েটি হেঁটে সামনের রাস্তায় চলে যায়। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘর থেকে সামনের রাস্তায় বের হই। এরপর দেখি, সোনা আমার ট্রাকের চাকার নিচে পড়ে আছে।
আকলিমা আরও বলেন, ঘরে থাকার সময় শারমিন বলছিল, জেঠি জাম খাব। ওর হাতে কয়েকটি জাম ছিল। তখন ওকে বললাম, মা তুমি খাও। এরপর ও জোর করে আমাকে একটি জাম দিয়ে গেল। তখন ও বলে জেঠি, আমাকে ডিম ভাজা দিবা। আরেকটু ভাত দিবা। আকলিমা বললেন, একটু সতর্ক হলেই শিশুটিকে বাঁচাতে পারতেন চালক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, বেপরোয়াভাবে ট্রাকটি পার্ক করার সময় শিশুটিকে চাপা দেয়।

বাসার সামনে বসে নীরবে চোখের পানি ফেলছিলেন শিশুটির বাবা শাহিন। তিনি পেশায় বাসের ইঞ্জিন মিস্ত্রি। ট্রাকস্ট্যান্ডেই কাজ করেন। শাহিন বলছিলেন, 'আল্লাহ আমার ওপর কত খুশি হয়ে মেয়েসন্তান দিল। এখন কেন আবার ওকে কেড়ে নিল! কী পাপ করেছি আমি!'

এলাকার বাসিন্দা ও প্রশাসনের লোকজনের ভাষ্য, অনেক জল ঘোলা করে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের মূল সড়ক ফাঁকা করা হলেও এখন আবার ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান সড়কটি দখল করে রাখছে। ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন এসেনসিয়াল ড্রাগস লিমিটেডের পাশের রাস্তাটির বড় অংশ অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। সরকারি রাস্তার ওপর পুরোনো ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মেরামত ও রং করানো হয়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রায় ৪০ ফুট রাস্তার ২০ ফুটই দখলে থাকে। এ ছাড়া রাস্তার দু'পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ নানা ধরনের দোকানপাট। এই এলাকাতেই বছর পাঁচেক আগে ট্রাকস্ট্যান্ডে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেছে এক যুবকের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছোট্ট শারমিনের ট্র্যাজেডিক ঘটনার পরপরই ট্রাকস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী মহল মামলা না করে ঘটনাটি সামান্য টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি কাজী আবুল কালাম সমকালকে বলেন, চালক জুয়েলকে আটক করা হয়েছে। তাঁর কোনো লাইসেন্স নেই। তবে লাইসেন্স পেতে আবেদন করেছেন। গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করে দেখা হচ্ছে। চালকের ভাষ্য, পার্ক করার সময় পেছনের চাকার নিচে শিশুটি পড়ে যায়। ওসি আরও জানান, শিশুটির বাবা ও স্বজনদের ডাকা হয়েছে। তবে তাঁরা মামলা করতে রাজি হচ্ছেন না। ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ নিতে চান। আমরা বলেছি, এ ঘটনায় মামলা না হলে অপরাধী পার পেয়ে যাবে। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেই মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

বিষয় : তেজগাঁওয়ে বাসার সামনেই ট্রাকচাপায় পিষ্ট শিশু রাকচাপায় পিষ্ট শিশু

মন্তব্য করুন