রাজধানীর ইংরেজি মাধ্যমের নামকরা একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সে। রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছিল এই কিশোর। এক পর্যায়ে হাত-পা বাঁধা নিখোঁজ ছেলের জিম্মিদশার ছবি আসে ব্যবসায়ী বাবার মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে। এরপর বাঁচার জন্য আদরের সন্তানের করুণ আকুতিতে ভরা ভিডিও পাঠানো হয় তাতে। হুমকি দিয়ে বলা হয়, অপহরণের শিকার হয়েছে ছেলে, বাঁচাতে হলে ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ লাগবে।

দাবি অনুযায়ী স্বজনরা মুক্তিপণের টাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা সেতুর নিচে যান। এরপরও আদরের সন্তানকে ফেরত না পেয়ে চিন্তায় পড়েন মা-বাবা। উপায়ান্তর না পেয়ে পুলিশের দারস্থ হন তারা। 'অপহরণের শিকার' সেই স্কুলছাত্রকে উদ্ধারে টানা নির্ঘুম রাত কাটে থানা পুলিশ আর গোয়েন্দাদের। শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস অভিযান। 'অপহরণকারীরা' বারবার স্থান পরিবর্তন করায় দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, গাজীপুর আর হবিগঞ্জে। উদ্ধারের পর শেষ পর্যন্ত জানা গেল, অনলাইন গেমে আসক্ত দুরন্ত ওই স্কুলছাত্র নিজেই সাজিয়েছিল অপহরণের নাটক! স্বজনরা জানান, গত ২০ মে সকালে রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে বের হয় ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোর। ওই দিন জুমার নামাজের পর বাসায় ফেরার কথা থাকলেও সে আর ফেরেনি। খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে বাড্ডা থানায় নিখোঁজের জিডি করেন তার বাবা। ওই রাতেই অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দিতে ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়। মারধরের নানা ছবি পাঠানো হয়। অপহরণকারীদের কথা মতো মুক্তিপণ দিতে নির্ধারিত স্থানে গেলেও কেউ টাকা নেয় না, সন্তানকেও ফেরত পাওয়া যায় না। বিষয়টি থানায় জানালে অপহরণের মামলা হয়। এরপর গোয়েন্দা (ডিবি) গুলশান বিভাগ তাকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে। শেষ পর্যন্ত গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের টঙ্গী থেকে উদ্ধার করা হয় তাকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) গুলশান বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, নামকরা একটি স্কুলের ছাত্র এবং ব্যবসায়ী পুত্র অপহরণ হওয়ায় তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। তবে অভিযানে নেমে তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্নেষণ করে বুঝতে পারেন, ঘটনাটি সাজানো। কিন্তু ওই কিশোরকে বাবা-মায়ের কাছে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত ডিবির কার্যক্রম চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কিশোরের এক বান্ধবীকে দিয়ে ফাঁদ পেতে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

ওই কিশোর কেন এমন অপহরণ নাটক সাজাল, জানতে চাইলে গোয়েন্দা কর্মকর্তা মশিউর বলেন, ওই স্কুলছাত্র দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফোনের ভিডিও গেমস-পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ভ্যালোরেন্ট, জিটিএ-ফাইভ, গ্র্যান্ড গ্যাংস্টার থ্রিডি, সাবওয়ে সার্ফারস, ওয়েস্ট গানফাইটারসহ নানা খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণে বাবা-মা তাকে শাসন করেন এবং মোবাইল ফোন থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেন। সে নিজেও মনে করে বাবা-মা তার প্রতি বিরক্ত এবং তাকে নিয়ে হতাশ। বাবা-মায়ের শাসন থেকে রক্ষা পেতেই সে এমন অপহরণ নাটক সাজায়।

ডিবির গুলশান বিভাগের এডিসি কামরুজ্জামান সরদার সমকালকে বলেন, হয়তো অভিভাবকদের সঠিক নজরদারির অভাবেই এই বয়সের কিশোররা বিপথে পা বাড়ায়। অনলাইন গেমে আসক্তি ছাড়াও এরা এ বয়সেই বিএফ-জিএফ (বয়ফ্রেন্ড, গার্লফেন্ড) সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ে। অপহরণ নাটক সাজানো ওই কিশোরও সেই সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছিল। সে বাসা থেকে বেরিয়ে ফেসবুকে পরিচয় হওয়া গাজীপুরে তার এক বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারে, সেই কিশোরী বান্ধবীর আরও অন্তত পাঁচজন বয়ফ্রেন্ড রয়েছে। এরপর সেখান থেকে চলে যায় হবিগঞ্জে। কিন্তু অপহরণের ৭ লাখ টাকা নিতে ভয় পাওয়ায় সে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সর্বশেষ ২০ হাজার টাকা দাবি করে। ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ওই বান্ধবীকে দিয়ে ফাঁদ পেতে স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া কিশোরের এক স্বজন বলেন, অপহরণের কথা জানিয়ে একের পর এক বার্তা ও ছবি পাঠানো হচ্ছিল। তা দেখে কারও বোঝার উপায় ছিল না যে, সে অপহরণ হয়নি। কখনও কাটা হাত, কখনও অচেতন অবস্থার, কখনও বাঁচার জন্য আকুতিভরা ভয়েস মেসেজ, কখনও হাত-পা বাঁধা ও নির্যাতনের ভিডিও, আর্তনাদের-আর্তচিৎকারের ভিডিও পাঠানো হচ্ছিল। তখন পাগলপ্রায় বাবা-মা ছেলেকে রক্ষার আকুতি জানায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকাও পাঠায়। ওই টাকা নিয়েই বান্ধবীর সঙ্গে গাজীপুরে ঘুরে বেড়ায় সে। মনোমালিন্য হওয়ার পর চলে যায় হবিগঞ্জে।