ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় ছাত্রদলের কর্মীরা দফায় দফায় হামলার শিকার হলেও ছাত্রলীগ দাবি করে আসছে- এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ। হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগের কেউ জড়িত নেই বলেও দাবি সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের। তবে এসব হামলার ফুটেজ বিশ্নেষণ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সংঘাতের অগ্রভাগে ছিলেন ছাত্রলীগের পদধারী নেতারা। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ঢাবির বাইরে থেকে আসা ছাত্রলীগের বহিরাগত নেতাকর্মীরাও।

মঙ্গলবার সংঘাতের শুরু হলেও গত বৃহস্পতিবার তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই দিন ক্যাম্পাসের দোয়েল চত্বর ছাড়াও হাইকোর্ট এলাকায় ঢুকেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে পেটানো হয়। এতে অন্তত গুরুতর অবস্থায় ছয়জন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসদের উদ্ৃব্দত করে ছাত্রদলের নেতারা জানিয়েছেন, ওই ছয়জনের মধ্যে ঢাবির বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের সহসভাপতি তানভীর আজাদী ও জুয়েল রানার অবস্থা সংকটাপন্ন। এই দু'জনকে গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট এলাকায় নির্বিচারে পেটানো হয়। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে।

ছাত্রদল দাবি করছে, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার- এই দু'দিনে ছাত্রলীগের দফায় দফায় হামলায় তাঁদের সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। যদিও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা বলে আসছেন, ছাত্রলীগ নয়, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাই ছাত্রদলকে প্রতিহত করেছে। ছাত্রলীগ তাঁদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে।

পদ্মা সেতু ইস্যুতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ করে ছাত্রদল। সেই সমাবেশে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে 'কটূক্তি ও আপত্তিকর' মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ তোলে ছাত্রলীগ। এরপর থেকেই সংগঠনটির বিভিন্ন হল ইউনিটের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে প্রতিহতের ঘোষণা দেন। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিতে সংবাদ সম্মেলনে আসার পথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রলীগের প্রতিরোধের মুখে পড়েন তাঁরা। এক পর্যায়ে সেখানে উভয়পক্ষ সংঘাতে জড়ায়। ওই দিন ছাত্রদলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। এই হামলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় ছাত্রদল। সেই কর্মসূচি পালন করতে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে চাইলে দোয়েল চত্বর এলাকায় ফের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। দু'পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হলেও ছাত্রলীগের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হাইকোর্ট এলাকা, কার্জন হল এলাকা ও জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় আশ্রয় নেন। তবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে এসব এলাকায় তাঁদের খুঁজে খুঁজে মারধর করেন। এ সময় হাইকোর্ট এলাকায় তিন আইনজীবী আহত হন এবং এক আইনজীবীর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

হামলায় অংশ নেন যারা: বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, প্রকাশিত ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে হামলায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। তাঁদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে আসা বহিরাগত ছাত্রলীগের নেতাদেরও দেখা গেছে। বহিরাগতদের মধ্যে যাঁদের শনাক্ত করা গেছে, তাঁদের মধ্যে হামলার সময়ে বেশ সক্রিয় দেখা যায় চুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও পাঠাগারবিষয়ক সম্পাদক সায়েদ ইমাম বাকের এবং ঢাকা কলেজের ছাত্র ও কেন্দ্রীয় উপসম্পাদক জুলফিকারকে। এ ছাড়া ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তিলোত্তমা শিকদার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ হলের সাধারণ সম্পাদক শরিফ আহমেদ মুনিম, হল ছাত্রলীগ কর্মী মাহমুদ চৌধুরী শান্ত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক সম্পাদক আল-আমিন রহমান, কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক রাশেদ ফেরদাউস আকাশ, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, শামসুন্নাহার হলের সভাপতি খাদিজা আক্তার ঊর্মি, সহসম্পাদক শেখ সাইফ, উপসম্পাদক আমানুল্লাহ আমান সাগর, পরিবেশ সম্পাদক শামিম পারভেজ, গণশিক্ষা সম্পাদক আব্দুল্লাহ হিল বারি, উপদপ্তর সম্পাদক নাজির, উপ-আপ্যায়ন সম্পাদক শাহিন তালুকদার, উপসম্পাদক কেএম রাসেল, উপদপ্তর সম্পাদক খান মোহাম্মদ শিমুল, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, কর্মী অভিজ্ঞান দাস অন্তু, অমর একুশে হলের সভাপতি এনায়েত এইচ মনন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হাসান সোহাগ, সহসভাপতি রাকিব হোসেন, বিজয় একাত্তর হলের সাবেক উপধর্মবিষয়ক সম্পাদক মুজিবুল বাশার ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগ কর্মী মো. নাজিম উদ্দীন সাইমুন।

তাঁদের মধ্যে রাকিব হোসেন, মুজিবুল বাশারসহ কয়েকজন প্রথমে হামলায় অংশ নিলেও পরে তাঁদের ছাত্রদল কর্মীদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে সহায়তা করতেও দেখা যায়। তাঁরা সবাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

নাম প্রকাশ না করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক নেতা সমকালকে বলেন, বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের মিছিলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীরাও ছিল। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কোনো বহিরাগত সন্ত্রাসীর প্রবেশ তো শিক্ষার্থীরা মেনে নেবেন না। এজন্যই প্রতিরোধ করা হয়েছে।

হামলাকারীদের সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন। কিন্তু এতে ছাত্রলীগ নেতাদের অংশ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একটি 'কম্পিটিটিভ টেররিজমের' খেলায় মেতে উঠেছে। তাঁরা তারেক জিয়াকে লাশ উপহার দেওয়ার এজেন্ডা নিয়ে নেমেছে। তাঁদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তাঁরা দেশি এবং আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। অস্ত্র ব্যবহার করতে পারা, ককটেল তৈরি করতে পারা- এগুলো ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ। ওই সংগঠনটিই সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সার্বিক কর্মকাণ্ডে জড়িত।

দেশি অস্ত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মহড়া ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেবে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রাব্বানী বলেন, প্রথমত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়নি। তবে উত্তেজনা ছিল। আর মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে বিস্তারিত অভিযোগপত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়া হয়েছে। আশা করি, তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।

ঢাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের নেতাকর্মী ছাড়াও সারাদেশ থেকে বহিরাগতদের জড়ো করেছে। হামলার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতাদের পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের জেলা ছাড়াও চট্টগ্রাম থেকেও ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাকেরকে রামদা হাতে কোপাতে দেখা গেছে।

আইসিইউতে ছাত্রদলের ৬ নেতা: এদিকে গত বৃহস্পতিবারের হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন, সদস্য সচিব আমান উল্লাহ আমানসহ ৪৪ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন আক্তার হোসেন।

তাঁরা হলেন- ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম, বিজয় একাত্তর হলের সহসভাপতি তানভীর আজাদী, কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য আতাউর রহমান, ছাত্রদল নেতা জুয়েল রানা, লিখন ও মানিক। এ ছাড়া হামলায় আহত গুরুতর আরও চারজন হাসপাতালে রয়েছেন।

তানভীর আজাদী এবং জুয়েল রানার চিকিৎসক সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম সমকালকে জানান, তানভীর ও জুয়েল রানাকে এতটাই পেটানো হয়েছে, তাঁদের মাংসপেশি গুরুতর জখম হয়েছে। তাঁদের কিডনি বিকল হওয়ার পথে। এ ছাড়া অন্য যাঁরা আইসিইউতে আছেন, তাঁদের অবস্থাও খুব বেশি ভালো নয়।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বলছেন, তানভীর আজাদীকে রড দিয়ে যেমন পেটানো হয়েছে, তেমনি মাথায় রামদা দিয়ে কোপানো হয়েছে। মাথার আঘাত গুরুতর। হাইকোর্টের সামনে তাঁর ওপর এ হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে, হাইকোর্টের মধ্যে জুয়েল রানাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছাত্রনেতা উজাবুলকে একটি কক্ষে আটক রেখে উপর্যুপরি লাঠি ও রডের আঘাতের পর ওই কক্ষ থেকে বের করেও একসঙ্গে অনেকে মিলে তাঁকে পোটায়।