মিরপুর এলাকায় কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাতেন তিন বছর আগে গুম হন। তিনি বেঁচে আছেন কিনা জানে না তার পরিবার। গুমের পর থেকেই তার স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতির জীবনের প্রতিটি দিনই দুঃসহ স্মৃতির।

শনিবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'আমার স্বামীর বিরুদ্ধে দেশের কোথাও কোনো থানায় একটা সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত ছিল না। তিনি কোনো দলের রাজনীতিও করতেন না। তার পরও তাকে গুম করা হয়েছে। তিনি এখন কেমন আছেন, কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কিনা তা জানি না। আমি সধবা নাকি বিধবা? তাকে খুঁজে পেতে দেশের প্রতিটি দরজায় গিয়েছি। কিন্তু কোনো দরজা খোলা পাইনি। এখনও রাত জেগে আমি আমার স্বামীর জন্য দোয়া করি, আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করি। এ ছাড়া আমাদের তো আর কোনো পথ খোলা নেই।' স্মৃতি অভিযোগ করেন, পারিবারিক শত্রুতার জেরে তার স্বামীকে র‌্যাবের তৎকালীন এক কর্মকর্তা গুম করেন।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে মায়ের ডাক সংগঠনের সমাবেশে এসেছিলেন তিনি। গুম হওয়া আরও অনেকের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন এ আয়োজনে।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলমের মেয়ে মাহফুজা আক্তার মুক্তা সর্বশেষ তার বাবাকে দেখেছিলেন তার কিশোরী বয়সে। তিনি বলেন, '১২ বছর ধরে আমি আমার বাবাকে ডাকতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাবা নেই। রাতে ঘুমানোর আগেও দেখি আমার বাবা নেই। আমার বাবা বেঁচে আছেন কিনা, কোথায় আছেন, কেমন আছেন তা এই ১২ বছরে জানতে পারিনি। বুকে পাথর বেঁধে এখনও খুঁজে ফিরি বাবাকে।' মুক্তা বলেন, 'আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে চাই।'

কুষ্টিয়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদ হোসেনের মা শাহিদা বেগম বলেন, 'আমরা সবাই আওয়ামী লীগ করি। আমাদের পুরো পরিবার এই দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু আমার ছেলেকে এই সরকার গুম করেছে। তাই এই সরকারের পতন চাই। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমি আমার সন্তানকে ফেরত চাই।' তিনি জানান, ২০১৫ সালের ২১ আগস্ট গাজীপুর থেকে তাঁর ছেলেকে অপহরণ করা হয়। তার ছেলে কুষ্টিয়া সদরে মেয়র পদে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন বলে আওয়ামী লীগের ওই এলাকার এমপি তাকে গুম করিয়েছেন।

সাজ্জাদের সহধর্মিণী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া বলেন, তিনি স্বামীকে খুঁজে পেতে আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতার সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা প্রথমে আশ্বাস দিলেও পরে আর খোঁজ নেননি। তার স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারি দলের একজন নেতা তাদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকাও নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৪১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বিভিন্নজনকে। কিন্তু তার পরও তার স্বামীকে ফেরত দেওয়া হয়নি।

রামপুরা থানা ছাত্রলীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন অপুর মা, রাসেলের ভাই, ওমর ফারুকের ছেলেসহ আরও অনেকে তাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের কান্নায় সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।

সভায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই সরকারের কাছে স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে লাভ নেই। তারা গুম হওয়াদের ফিরিয়ে দেবে না। এই সরকার জালেম সরকার। তারা দিনের ভোট রাতে করে জোর করে ক্ষমতায় আছে। তাই এবার জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনে নামতে হবে, এই সরকারকে বিতাড়িত করতে হবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আধুনিক কোনো রাষ্ট্রে গুম হতে পারে না। জনগণের সরকার থাকলে রাষ্ট্রে কোনো গুম, অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা থাকতে পারে না। যে দেশে এসব ঘটনা ঘটে, সেসব রাষ্ট্র বর্বর।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, গণঅধিকার পরিষদের নেতা সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ।

খুলনার কলেজছাত্রসহ ৩ জনের সন্ধান চান স্বজনরা: খুলনা ব্যুরো জানায়, শনিবার খুলনায় এক অনুষ্ঠানে কলেজছাত্রসহ গুম হওয়া ৩ জনের সন্ধান চেয়েছেন স্বজনরা। তাদের মধ্যে বাগেরহাটের ব্যবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান হাওলাদার দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নিখোঁজ। ২০১৬ সাল থেকেই খোঁজ নেই সাতক্ষীরার হোমিও চিকিৎসক মোখলেসুর রহমান জনি ও যশোর বেনাপোলের কলেজছাত্র রেজোয়ান হোসেনের।

খুলনা মহানগরীর জাতিসংঘ পার্কের সামনে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে এই তিন ব্যক্তির স্বজনরা অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ওই তিনজনকে আটক করা হয়। এরপর অনেক চেষ্টা করেও কোনো সন্ধান মেলেনি। তাঁদের ফেরত পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন স্বজনরা। এ কর্মসূচির যৌথ আয়োজক ছিল 'মায়ের ডাক' ও 'হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্ক'।

হাবিবুর রহমানের ছেলে কলেজছাত্র শাওন হাওলাদার মা মাহমুদা বেগমকে নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন। তিনি জানান, ২০১১ সালের ৬ জুলাই মোরেলগঞ্জের বাড়ি থেকে পুলিশ তাঁর বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। দীর্ঘ ১১ বছর স্বামীর অপেক্ষায় থেকে মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন ঠিকঠাক চোখেও দেখতে পান না। অপরাধ করে থাকলে বিচার করত। এভাবে একটি মানুষকে উধাও করা হলো! বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আকুতি জানান তিনি।

মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক মুহাম্মদ নুরুজ্জামান দিবসের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি ড. জাকির হোসেন, সদস্য সচিব কাজী মোতাহার রহমান বাবু, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনা জেলা সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম, গ্লোবাল খুলনার আহ্বায়ক শাহ মামুনুর রহমান তুহিন, রেজোয়ান হোসেনের বড় ভাই রিপন হোসেন, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আলমগীর আশরাফ, মানবাধিকারকর্মী শেখ আবদুল হালিম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ছায়াবৃত্তের প্রধান নির্বাহী মাহবুব আলম বাদশা প্রমুখ।