পরিবারে সচ্ছলতা আনতে ওয়ার্কশপে চাকরির প্রলোভনে লিবিয়া যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক ছামিউল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল-বিদেশে উপার্জিত টাকায় দীর্ঘদিনের অসুস্থ বাবাকে ভালো চিকিৎসক দেখাবেন। বাবা-মাকে ভালো খাওয়াবেন-পরাবেন। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলবেন। স্বপ্ন বাস্তবায়ন তো অনেক দূরে, বিদেশে বন্দি জীবনে নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। থাকতে হয়েছে অর্ধাহারে-অনাহারে। ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর কেবল জীবনটুকু নিয়ে গত ১২ মে দেশে ফিরে আসেন তিনি।
দেশে এসে পড়েছেন আরেক বিপাকে। বাড়িতে থাকতে পারছেন না পাওনাদারদের আতঙ্কে।
ছামিউল ইসলাম সমকালকে বলেন, আমি এখন কী করব বুঝতে পারছি না। নিজের বাড়ি না থেকে অন্য জায়গায় আত্মগোপনে থাকতে হচ্ছে ঋণের কারণে। তিনি জানান, তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। গ্রামে অটোরিকশা চালাতেন। দিনে ৫-৬শ টাকা আয় হতো। তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো তাঁর। পরিবারে বাবা-মা ও স্ত্রী এবং এক সন্তান। বাবা প্রায় এক যুগ ধরে অসুস্থ। প্রতিদিন ১৫০-২০০ টাকার ওষুধ খেতে হয়। টানাটানির সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ফের লিবিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। লোকমুখে শুনেছেন, একবার কষ্ট করে লিবিয়ায় পৌঁছাতে পারলে আর অভাব থাকবে না। সংসারে আসবে সচ্ছলতা। তাঁর স্বপ্নের কথা পৌঁছে যায় গ্রামের দালালদের কাছে, যাঁরা নানা প্রলোভনে টুরিস্ট ভিসায় মানুষকে বিদেশ পাঠিয়ে টাকা হাতিয়ে নেন। দেশে ফেরার পর ওই দালালদের বিরুদ্ধে গত শনিবার কসবা থানায় মামলা করেছেন তিনি। অভিযুক্তরা হলেন-আখাউড়া উপজেলার ভাটামাথা গ্রামের জুয়েল মিয়া, ছামিউলের গ্রামের হারুন মিয়া এবং ফরহাদ মিয়া ও বাবু। ফরহাদ ও বাবুর গ্রামের ঠিকানা অজ্ঞাত।
ছামিউল জানান, অভিযুক্ত জুয়েল ১০ বছর লিবিয়ায় ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি লিবিয়ায় লোক পাঠান। গত বছরের অক্টোবরে জুয়েল তাঁকে জানান, সাড়ে চার লাখ টাকা খরচে তিনি তাঁকে সঙ্গে করে লিবিয়ায় নিয়ে যাবেন। সেখানে তাঁর ওয়ার্কশপ আছে। যেহেতু তাঁরা দু'জনই একই এলাকায়, তাই বিদেশে থাকবেন একই সঙ্গে এবং তাঁর ওয়ার্কশপে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দেবেন- এমন প্রলোভন দেওয়া হয়। তবে সাড়ে চার লাখ টাকার মধ্যে দেশে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। বাকি চার লাখ টাকা তাঁর ওয়ার্কশপে কাজ করে পরিশোধ করতে হবে।
প্রস্তাবে রাজি হয়ে ছামিউল নিজের শেষ সম্বল অটোরিকশাটি ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে সেই টাকা গত অক্টোবরে জুয়েলের হাতে তুলে দেন। এরই মধ্যে অভিযুক্ত হারুনের সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে কথা হয় ছামিউলের। কথা ছিল ছামিউলের সঙ্গে লিবিয়ায় যাবেন জুয়েল ও হারুন। যাওয়ার বিষয়ে তাঁদের কাগজপত্র প্রস্তুত হয়নি জানিয়ে গত নভেম্বরে টুরিস্ট ভিসায় ছামিউলকে একা পাঠানো হয় দুবাইয়ে। দেশটিতে থাকা জুয়েলের এক সহযোগী তাকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে সারজায় একটা ক্যাম্পে আটকে রাখেন। দিনে একবেলা খাবার দেওয়া হতো। সেখানে আরও ১২০ জন বাংলাদেশিকে আটক থাকতে দেখেন তিনি। ১২ দিন সেখানে আটকে রেখে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন জুয়েলের সহযোগী। দেশে ওই টাকা পরিশোধ করার পর সেখান থেকে ছামিউলসহ ২৫ বাংলাদেশিকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। বিমানবন্দর থেকে তাঁদের নিয়ে প্রাইভেটকারে আধাঘণ্টা পথ দূরে একটি জঙ্গলবাড়িতে নিয়ে যান দুই লিবীয় নাগরিক। ওই দুইজন তাঁদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে শুরু করেন নির্যাতন। বলা হয়, বাড়িতে ফোন করে সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করলে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হবে।
ছামিউল বলেন, 'টাকা দিতে এক সপ্তাহ দেরি হওয়ায় প্রতিদিন মারধর করত আমাকে। অন্যদের মারধর করত। ব্যথায় চিৎকার করলেও নির্যাতন বন্ধ হতো না। দিনে মাত্র একটি ছোট রুটি আর একটি ছোট পানির বোতল দিত। তা খেয়ে খিদে মিটত না। খিদের কথা জানালে আরও মারত।' দেশে তাঁর বাবা-মা ধারদেনা করে জুয়েল ও হারুনকে দাবিকৃত টাকা দেওয়ার পর মারধর বন্ধ হয়। এরপর তাঁকে একটি বেকারিতে বিক্রি করে দেয়। চার মাস কাজ করলেও বেতন দেওয়া হয়নি। কিছুদিন পর জুয়েল ফোনে ছামিউলকে প্রস্তাব দেন-লিবিয়ার অবস্থা ভালো না। আরও ছয় লাখ টাকা দিলে তাঁকে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পাঠিয়ে দেবেন তিনি। কিন্তু এই টাকা দিতে অপারগতা জানান ছামিউল ও তাঁর মা-বাবা। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য জুয়েলকে চাপ দেন পরিবারে সদস্যরা। কিন্তু তিনি নানা টালবাহানা শুরু করেন। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় গত ১২ মে ছামিউল দেশে ফেরেন। অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি টাকা ফেরতের দাবি জানান তিনি।