শুক্রবার প্রকাশিত এক জরিপের ফলে ঢাকার গণপরিবহনে নারী যাত্রীকে যৌন হয়রানিসহ নানারকম হেনস্থার শিকার হওয়ার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে পরিস্কার- আমাদের গণপরিবহন এখনও নারীবান্ধব নয়। শনিবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩ থেকে ৩৫ বছর বয়সী রাজধানীর ৮০৫ জন নারীর ওপর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঁচল পরিচালিত ওই জরিপে উঠে এসেছে, নগরীর গণপরিবহনে চলাচলকারী নারীর ৬৩ শতাংশ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন, যাঁদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ শিকার হন যৌন হয়রানির। গণপরিবহনে নারী হয়রানির এমন দুঃখজনক চিত্র এর আগেও বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১৯ সালে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন পরিচালিত জরিপটির কথা বলা যায়, যেখানে ৮৪ শতাংশ নারী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার গণপরিবহনের স্টাফ বা কর্মীদের দ্বারা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার তথ্য উঠে আসে। আসলে শিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রে জেন্ডার ভারসাম্য বা সমতা অর্জন বিষয়ে বিশেষ করে গত এক দশকে অনেক অগ্রগতি ঘটলেও এটা মানতে হবে, আমাদের সমাজে জেন্ডার সেনসিটিভিটি এখনও যথেষ্ট মাত্রায় গড়ে ওঠেনি। কথাটা এ কারণে বলা হলো যে, শনিবার সমকালেরই আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবার হয়রানির শিকার নারীর প্রতিকার পেতে সাহায্য করার জন্য পুলিশ সদরদপ্তরে ২০২০ সালের নভেম্বরে যে উইংটি খোলা হয়েছে তাতে গত দেড় বছরে ১৭ হাজার নারী সাইবার অপরাধের প্রতিকার চেয়ে যোগাযোগ করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের ৪৩ শতাংশ অভিযোগ করেছেন, ফেসবুকে তাদের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে যৌন হয়রানিসহ নানা হয়রানি করা হয়েছে।

পাবলিক বাসে নারীর জন্য যে আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং রাজধানীতে যে আলাদা বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা আমরা জানি। এমন উদ্যোগের পেছনের উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো গণপরিবহনে নারী হয়রানি কমানো- তাও আমাদের জানা আছে। কিন্তু এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, পাবলিক বাসে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের বিষয়টি শুরুর দিকে মোটামুটি কার্যকর হলেও এখন অন্তত ঢাকা শহরে ওসবের কোনো বালাই নেই। করোনা মহামারির আগে এ বিষয়ে রাজধানীতে মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হতে দেখা গেলেও এখন তা দেখা যায় না। রাজধানীতে শুধু নারীর জন্য যে সংখ্যক বাস চালু আছে, তা সমুদ্রে শিশিরবিন্দুবৎ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালে দেওয়া এক হিসাবমতে, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি, যা মোট কর্মজীবীর অন্তত ৩০ শতাংশ। এ কর্মজীবী নারীর একটা বড় অংশের অবস্থান যে ঢাকা শহরে, তা কারও অজানা নয়। কিন্তু রাজধানীতে শুধু নারীর জন্য ক'টি বাস চলে? ১৫-১৬টির বেশি নয়। এটাও মনে রাখা দরকার, ঢাকার মতো অত্যন্ত ব্যস্ত শহরে শুধু কর্মজীবী নারীরাই ঘরের বাইরে যান না; বাজার করাসহ সংসারের নানা প্রয়োজনে অসংখ্য গৃহিণীকে গণপরিবহনে উঠতে হয়। তবে আমরা মনে করি, শুধু নারীর জন্য গণপরিবহনে আসন সংরক্ষণ ও পৃথক বাসের ব্যবস্থা করে আলোচ্য সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ জন্য কার্যকর আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। যেমন বর্তমানে গণপরিবহনে নারী হয়রানি ও যৌন হয়রানির প্রতিকারে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। আবার দণ্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কিছু ধারায় সুযোগ থাকলেও নানা বাস্তব কারণেই প্রতিকারপ্রার্থীরা এর আশ্রয় নিতে উৎসাহী হন না। ৯৯৯ বা ১০৯-এ ফোন করে ভুক্তভোগী নারীরা সাহায্য চাইতে পারেন; তবে এর সপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ সরবরাহের জন্য গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা যায়।

গণপরিবহনে নারীর হয়রানি বন্ধে ব্যবস্থা যা-ই নেওয়া হোক, তা দ্রুত নিতে হবে। আর তা যাতে কার্যকর হয় সে জন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এর পাশাপাশি সমস্যাটি সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো দরকার। মনে রাখতে হবে, সমস্যাটি চলতে থাকলে তা শুধু ভুক্তভোগী নারীর শারীরিক-মানসিক ক্ষতির কারণ হবে না; নারীর অগ্রগতিকেও থামিয়ে দেবে, যা দেশের আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রগতির জন্য মোটেও সুখকর কিছু হবে না।