রাজধানীর হাতিরঝিল লেকপাড় এমনিতেই নির্জন। সাতসকালে গুলশানের পুলিশ প্লাজার উল্টো পাশটা থাকে আরও শব্দহীন। সেখানে সবুজ গাছগাছালির মিতালি। সেই সবুজের আড়ালেই ঝরেছে রক্ত; এক গণমাধ্যমকর্মীর রক্ত। গতকাল বুধবার সকালে লেকপাড়ে রক্তাক্ত ওই যুবকের নিথর দেহে প্রথম চোখ পড়ে স্থানীয় ছিন্নমূল শিশুদের। খবর পেয়ে লাশ উদ্ধারের পর ওই যুবকের নাম-পরিচয় তালাশে নামে পুলিশ।

পরে পুলিশ জানতে পারে, ওই যুবক আবদুল বারী (২৭); তিনি বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের সিনিয়র প্রোডাকশন এক্সিকিউটিভ। খুনের ধরন ও আলামত দেখে পুলিশ বলছে, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। লাশের পাশে মেলে রক্তমাখা ছুরি, মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন। তাঁর পরনে থাকা চেকশার্ট ও প্যান্ট ছিল ভেজা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, জীবন বাঁচাতে পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা করেছিলেন বারী। এরপর লেক থেকে পাড়ে তুলে হয়তো গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।


এদিকে বারীর মা-বাবা ও তাঁর সহকর্মীরা বলছেন, বারী ছিলেন অত্যন্ত চুপচাপ ও শান্ত প্রকৃতির। কর্মস্থলেও ছিলেন সবার স্নেহভাজন। তাঁর সঙ্গে প্রকাশ্যে কখনোই কারও বিরোধ দেখা যায়নি। তবে পরিকল্পিত খুনের ঘটনা প্রমাণ করে, নির্বিবাদী আর অন্তর্মুখী বারীরও কোনো গোপন শত্রু বা প্রতিপক্ষ ছিল। খুনের রহস্য ভেদ করতে বেশ কয়েকটি ক্লুতে চোখ রেখে তদন্তে পা ফেলেছেন গোয়েন্দারা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আর্থিক কিছু নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল কিনা- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া কারও স্পর্শকাতর কোনো কিছু জেনে ফেলায় বারী চক্ষুশূল হয়েছিল কিনা, তাও জানার চেষ্টা গোয়েন্দাদের।

এ ঘটনায় গতকাল রাতে বারীর ভাই আবদুল আলীম বাদী হয়ে অচেনা ব্যক্তিদের আসামি করে গুলশান থানায় মামলা করেছেন।

রাজধানীর মহাখালীর নিজ কর্মস্থলের অদূরে মাদ্রাসা গলির ১০৯/২ বাসার দ্বিতীয় তলায় একটি মেসে বাস করতেন বারী। ওই মেসে থাকেন ৯ জন। এর মধ্যে বারীর সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন তেজগাঁও সরকারি কলেজের ছাত্র রাব্বী রহমান। গতকাল দুপুরে রাব্বী জানান, মঙ্গলবার সারাদিন বাসায় ছিলেন বারী। দুপুরে মেসের জন্য বাজারও করেন তিনি। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাঁরা একসঙ্গে খাবার খান। সাড়ে ৫টার দিকে রাব্বী বাসা থেকে বের হন। দুপুরে খাবারের সময় বারী জানিয়েছিলেন, সন্ধ্যার পর কোনো এক জায়গায় যাবেন।

রাব্বী আরও জানান, বারীকে কোনো প্রশ্ন করলে মাঝেমধ্যে অনেক দেরিতে উত্তর দিতেন। চেহারা দেখে মনে হতো বিষণ্ণতায় ভুগছেন। মেসের সবাই তাঁকে খুব পছন্দ করত। বুধবার গভীর রাতেও বাসায় না ফেরায় সবাই ধরে নেয়, হয়তো কোথাও বেড়াতে গেছেন।
একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, তথ্যপ্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, মঙ্গলবার রাত ১০টা পর্যন্ত মহাখালী এলাকায় বারীর মোবাইল ফোন সচল ছিল। সিসিটিভির ফুটেজ বলছে, রাত ৮টা ৪৯ মিনিটে তিনি বাসা থেকে একা বের হন। মঙ্গলবার তাঁর ফোনে মাত্র তিনটি কল ঢুকেছে। যাঁদের সঙ্গে সর্বশেষ তিনি কথা বলেছেন, তাঁদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর মধ্যে একজনকে ডেকে নিয়েছেন গোয়েন্দারা। সোহেল নামের ওই যুবক বারীর খালাতো ভাই।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি মো. আসাদুজ্জামান জানান, সুরতহালে যে ধরনের আলামত পাওয়া যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট- বারী খুন হয়েছেন। গলা ও বুকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। লাশ উদ্ধারের সাত-আট ঘণ্টা আগে খুন করা হতে পারে। যে এলাকায় লাশটি পাওয়া গেছে, সেখানে কারও একাকী যাওয়ার কথা নয়। পূর্বপরিচিত কেউ ডেকে নিয়েছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কলাগাছের নিচে লেকপাড়ে সবুজ ঘাসের মধ্যে ছোপ ছোপ রক্ত। ঘটনাস্থল পাহারা দিচ্ছেন পুলিশের কয়েকজন সদস্য। আশপাশে আছেন উৎসুক জনতাও। ঘটনাস্থল থেকে আলামতের নমুনা নিয়ে তা পরীক্ষা করছে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট।
গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, হত্যার মোটিভ ও খুনি শনাক্তে নানামুখী তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলে সিসিটিভি নেই। তবে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে দেখা হচ্ছে। রাতে হওয়ায় অনেক ফুটেজ অস্পষ্ট।

ডিবিসি নিউজের প্রধান প্রতিবেদক রাজীব ঘোষ জানান, ডিসেম্বরে ডিবিসিতে যোগ দেন বারী। এর আগে মোহনা টিভিতে ছিলেন তিনি। নরম স্বভাবের বারী অফিসে কারও সঙ্গে খুব বেশি মিশতেন না। মঙ্গলবার ছিল তাঁর সাপ্তাহিক ছুটির দিন।
বারীর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদরের শিয়ালকোট ইউনিয়নের চণ্ডীদাসগাঁতী গ্রামে। তিন বোন ও দুই ভাই আর মা-বাবাকে নিয়ে তাঁদের সংসার। বেশ সংগ্রাম ও কষ্ট করে ঢাকার বিউবি থেকে প্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করেন বারী। গতকাল দুপুরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রামে নেন স্বজনরা।

বারীর বাবা মুদি দোকানি আবদুল্লাহ শেখ বলেন, এলাকায় আমার ছেলের কোনো শত্রু নেই। ঢাকায় কোনো বিরোধ ছিল কিনা, তা তো জানি না। যার স্বভাব এমন মাটির মতো, তার আর কী শত্রু থাকবে!

বারীর মা আলেয়া খাতুন বলেন, মঙ্গলবার ছেলের সঙ্গে ফোনে শেষ কথা হয়েছে। ভালোই তো আছে বলছিল। ছেলের শত্রু আছে, তা বিশ্বাস হচ্ছে না। চাকরি করে মেসে অনেক কষ্ট করেই থাকত। তার বিয়ের কথাবার্তাও চলছিল। কারা নির্মমভাবে হত্যা করল, এটা জানতে চাই। বিচার চাই।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি]


বিষয় : হাতিরঝিলে গণমাধ্যমকর্মীর লাশ গণমাধ্যমকর্মীর লাশ

মন্তব্য করুন