কদিন আগে আমার দুটো অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে। গল্পের আসরে তাদের আমি আধিভৌতিক বা অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা হিসেবে চালিয়ে দিতে পারি।
এখন লঘুভাবে কথাটা বলতে পারলেও যখন ঘটেছিল তখন কিন্তু ভেতর থেকে কিছুক্ষণ তাদের গ্রহণ করাটা আমার জন্য কষ্টকর হয়েছিল। আমার ভেতরের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের জগৎও কিছুটা উত্তাল হয়েছিল। এই ভেবে যে এ আমি কী দেখলাম বা আমার সঙ্গে এমন কেন হলো।
কিন্তু এও জানি মানুষের সঙ্গে এমন বরাবরই ঘটেছে। তখন প্রতিটা ধর্ম বা দর্শনের ভক্ত অনুসারী সেখানে নিজ নিজ ধর্ম বা দর্শনকে দেখতে পেয়ে উৎফুল্ল হয়েছে। যারা তেমন নন, তাদের মন কিছুক্ষণের জন্য হলেও আচ্ছন্ন হয়েছে।
আমার জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটেছে, যেগুলো কোনো কারণে আমার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হলেও আমি তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা পাইনি। আমি বলব না 'থেকে যাক কিছু ব্যাপার ব্যাখ্যার অতীত।'
ব্যাখ্যা আবিস্কৃত হোক আমি চাই। কারণ, তাতে প্রকৃতির রহস্যময়তার পরিধি নতুন সীমানা অর্জন করে। এককালে মানুষ যা কিছু নিয়ে আলাপে একটা ভৌতিকতার স্বাদ পেত, আজ তার অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। বজ্রপাত কারও হাতুড়ি থেকে বেরিয়ে এলো অথবা তা ইবলিশকে আঘাত করতে ছুটছে, এমন কল্পনার অবকাশ এখন অনেকেরই নেই। তাই বলে সে বঞ্চিত তা নয়।
রত্ন তো কেবল চিনে তুলে নেওয়ার ব্যাপার। এখন বজ্রের কোয়ান্টাম ভুবন নিয়ে কল্পনায় তলিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে, যা আগে ছিল না।
আমার বিশ্বাস, মানুষ যত জানবে তত নতুন পথে তার ভেতর জাদুকরী ভ্রমের জগৎ সৃষ্টি হবে। যে কারণে গড় মানুষের ভেতর অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস বা উচ্চতর এক বা একাধিকের অস্তিত্ব সংক্রান্ত যে ধর্মবোধ, তা চিরকালই কোনো না কোনো রূপে বজায় থেকে যাবে। মানুষের প্রবণতার ভেতর এ আছে বিধায় কখনোই বিলুপ্ত হবে না।
আরও একটা ব্যাপার তাতে ইন্ধন জোগাবে। তা হলো মানুষের চোখ তার মস্তিস্কেরই অংশ এবং মানুষের শ্রুতির খানিকটা তার স্মৃতির অংশ। চিরকাল তাই আমরা এমন অনেক কিছুই দেখব; যা দেখতে চাই, শুনব যা শুনতে চাই।
এমনও হতে পারে যে সত্যটা হয়তো মৃত্যুর আগে আমরা কোনোদিনও জানতে পারব না।
আর মৃত্যুর পর তা ব্যক্ত করতে পারব না।

১.
এ বছর ১১ মে আমার নানা একটা দীর্ঘ ও সম্পন্ন জীবন কাটিয়ে চুরানব্বই বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যু ঘিরে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মামাবাড়িতে আমরা আত্মীয়- পরিজন মিলিত হয়েছিলাম।
এই সময়গুলোয় এমন অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয় যাঁদের সঙ্গে হয়তো ইহলোকে কখনোই দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। যা হোক, ১২ মে দুপুরের কিছু আগে তাঁর মাতামহের মরদেহ সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধির পাশেই আমার নানুর সমাধি, যিনি আরও পাঁচ বছর আগে দেহ রেখেছেন।
তাঁদের কবরের কাছে থাকা দুটো গাছ আছে; যারা আমার বিশেষ প্রিয়। একটা কদম গাছ, আরেকটি সোনালু গাছ। দু'জনের মৃত্যুর সময়ই কাছাকাছি হওয়ায় দু'বারই দেখেছি, সোনালু বৃক্ষ থেকে উজ্জ্বল হলুদ ফুলের আশ্চর্য মঞ্জরি নেমেছে। একই সঙ্গে একটা-দুটো কদমও ফুটেছে।
মিরসরাই জলপাহাড়ি এলাকা। এখানকার সবুজ ও সুন্দর বর্ণনাতীত।
নানাকে আমি নানাভাই ডাকতাম আর তিনি আমাকে ডাকতেন গাজীসাহেব।
আমার স্মৃতিতে তিনি আজীবন কুটকুট করে হাসতে থাকা এক আনন্দময় বৃদ্ধ হয়েই থাকবেন। তাঁর সঙ্গে আমার কত অজস্র বেড়ানোর স্মৃতি, খেলার স্মৃতি। একেকদিন স্কুল থেকে ফিরে দরজার গোড়ায় তাঁর পামশু জোড়া দেখলে অদ্ভুত আনন্দ হতো। তার ঢোলা পায়জামা যখন দরজার ওপর শুকোত, তাকিয়ে থেকে থেকে আমার গলা রুদ্ধ হয়ে উঠত কেন জানি না। তাঁর কিছু দেখামাত্র অকারণেই ভালো লাগত। আমার বেলাতেও নিশ্চয়ই তাই। আমার বাবা যখন মারা গেলেন, নানাভাই ভেবেছিলেন আমি জানাজায় আসা গ্রামবাসীকে উদ্দেশ করে কিছু বলব। এমন কিছু বলব যে গৌরব বোধ করবেন। তাঁর চোখের সেই দৃষ্টি আমি কখনও ভুলব না। তাঁর অপেক্ষা ব্যর্থ করে দিয়েছিলাম সেদিন। এত বেশি অভিভূত ছিলাম আমি যে কিছু বলতে পারিনি।
শেষদিকে আমাদের ভেতর বিপুল মানসিক দূরত্ব তৈরি হলেও, আমি জানতাম, ওঁর সঙ্গে আমার যে বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক শৈশবে বজায় ছিল তা আজীবনের। আমি তাঁকে আমার পঁয়ত্রিশ বছর পর্যন্ত পেলাম বিধায় তাঁর উপস্থিতি আমার অভ্যাসগত হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ এই অনুপস্থিতি ব্যক্তিগত হাহাকারের বাইরেও অনভ্যাসের একটা ব্যাখ্যাতীত শূন্যতা তৈরি করেছিল।
তিনি সমাহিত হওয়ার পর পরিজন ও দেখতে আসা গাঁয়ের মানুষকে যথাসাধ্য আপ্যায়ন করানো হলো। তখন দুপুর। সময় ক্রমে বিকেলে গড়াল। আমি পার্লিয়াকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়ে পাহাড়সারি দেখে এলাম।
বাড়ির সীমানা থেকে বের হয়ে পূর্বদিকে তাকালেই মিরসরাইয়ের পাহাড়সারি দেখা যায়।
বাড়ি থেকে একটু দক্ষিণে গেলে একটা সরু খাল আছে দু'পাশে বড় বড় গাছপালায় ঘেরা। খালের ওপর একটা শিথিল ধনুকের মতো সেতু। ওখানে দাঁড়ালে বাতাসের স্রোত টের পাওয়া যায়। আমরা দু'জন নীরবে সেখানে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মানুষের মনের গুণ কাজ করে যাচ্ছিল নীরবে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর আবহ কাটিয়ে উঠছিল সবাই। হয়তো ভেজা চোখেই একটু-আধটু হাসছে, কথা বলছে। কথা তো কম জমা নেই। কতদিন দেখা নেই কতজনার সঙ্গে।
আমি ঘর-বাহির করতে করতে রাত ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছিলাম। একসময় রাত ৯টা নাগাদ আকাশ ঝকঝকে করে দিয়ে ঠিক মাথার ওপর চাঁদ আবির্ভূত হলো।
পুরো গোল চাঁদ নয়। একটাপাশ অল্প খানিক ক্ষয়ে যাওয়া। কিন্তু আলোর কমতি নেই। চাঁদকে ঘিরে রঙিন আলোর একটা দিঘি বেশ স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছিল। আসন্ন বৃষ্টির লক্ষণ।
রাতের খাওয়া হলো, সবাই নিজ নিজ কোণে ওম খুঁজে নিল। ক্রমশ গভীর হলো প্রহর। আমি বাইরে পায়চারি করছি। চোখে ঘুম নেই।
রাত তখন আড়াইটা। একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা মাথার ভেতর। যেন মস্তিস্কের ভেতর তরল বিষ থিকথিক করছে। যেন কত রাত আমি না ঘুমিয়ে আছি। ধীরে ধীরে আমরা যেখানে উঠেছি, মূল বাড়ি থেকে আলাদা সেই বাড়ির বারান্দায় গিয়ে উঠলাম। কিন্তু ঘরে ঢুকলাম না। বারান্দার শিক ধরে বাইরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
সামনে ফলগাছের বাগান। সেই বাগানের পেছনে বয়সী গাছপালা অদ্ভুত ঘন হয়ে আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমের আকাশ দেখতে পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু গাছপালা প্রায় পুরো আকাশটা ঢেকে দিয়েছে।
আমার পেছনে ঘরের ভেতর মা ঘুমে রয়েছেন আর পার্লিয়া ঘুমের চেষ্টারত। বাতাস যেমন ভেজা তাতে মনে হচ্ছিল কোথাও গোপনে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামছে। থেকে থেকে বাতাস আসছে আর গাছের ডালপালা দোল খাচ্ছে সুন্দর। হঠাৎ দেখি পশ্চিমের ওই ছেঁড়া ছেঁড়া আকাশে গনগনে সোনালি চাঁদ!
চাঁদের এমন অপার্থিব রূপ আমি কোনোদিন দেখিনি। কাঁচা সোনার ঔজ্জ্বল্যের যে সুখ্যাতি করে মানুষ, এ যেন তাই। তবে পার্থক্য এই যে, সোনালির ওপর লালের পাতলা পর্দা একটা সূক্ষ্ণভাবে দেখলে টের পাওয়া যায়।
আমি মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। এই অপ্রাকৃত রূপ একা দেখা যায় না। পার্লিয়া যদি ঘুমিয়েও থাকে ওকে আমার জাগাতে হবে এই ভাবছি। ও-সহ কোথায় দাঁড়িয়ে আরও ভালোভাবে এই চাঁদ দেখতে পাব, একটু পরখ করতে আমি বারান্দা ছেড়ে মাটিতে নামলাম।
দিনভর থেকে থেকেই বৃষ্টি হয়েছে। পায়ের নিচে তাই নরম মাটি, ঘাস আর ঝরা ভেজা পাতা। অন্ধকারে প্রায় দশ কদম চলে এসেছি। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি পশ্চিম আকাশের দিকে কিছুই নেই। গাছপালার সেই ঘন আচ্ছাদন ভেদ করে ছেঁড়া আকাশ এক-আধটু দেখা যাচ্ছে কিন্তু কোথাও কোনো চাঁদ নেই।
চাঁদটা আড়াল হতে দিলাম বলে নিজের ওপর একটু বিরক্ত হয়ে বিকল্প পথ খুঁজছি, হঠাৎ আমার সারা শরীর ভয়ে ছমছম করে উঠল। আমার ভেতর থেকেও যে আমিটা ঠিক আমি নই, সে আমাকে থামাল।
'আর এক পাও এগিও না!'
রাত বোধহয় আড়াইটার মতো বাজে। জলভেজা গ্রাম। ঘন অতীতের মতো গাছপালা, দূরে পাহাড়, চাঁদ, তবু কিন্তু আমার মনের ভেতর কিন্তু এক মুহূর্ত আগেও কোনো দ্বিতীয় চিন্তা আসেনি। যেমন একটা সচেতন স্বাভাবিক সাহস মানুষের মনে দিনের আলোয় বজায় থাকে ঠিক তেমনটাই ছিল। হঠাৎ কী হলো?
অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা আদিম আতঙ্কের লতা যেন আমার পা জড়িয়ে ধরে ক্রমশ ওপরদিকে উঠে আসতে চাইছে। এক নিখাদ ভয়ের ঢেউ একটা গোপন জ্বরের জন্ম দিচ্ছে শরীরের ভেতর। আমি পেছাতে শুরু করলাম।
হেঁটে হেঁটে আবার বারান্দায় গিয়ে উঠলাম। যেখানে দাঁড়িয়ে সেই গনগনে গোল চাঁদটা দেখেছিলাম সেদিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। কিচ্ছু নেই।
'পার্লিয়া, পার্লিয়া?'
পেছনে ঘরের দরজা ফাঁক করে ডাকলাম আমি। মশারির ভেতর থেকে সচকিত পার্লিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাল।
'কী হয়েছে?'
আমার গলা শুকিয়ে গেছে। বললাম-
'না, কিছু না।'
যদি ওটা সত্যি চাঁদ হয়ে থাকে আর মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে থাকে তো আবার সে দেখা দেবেই। এমন উজ্জ্বল চাঁদের আকাশে কালো মেঘের ক্যারাভান কতক্ষণইবা যাওয়া সম্ভব? আমি দশ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম আগের জায়গায়। চাঁদ নেই।
ঠিক তখন গাছপালার দিকটা লক্ষ্য করে আমি প্রথমবারের মতো বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। যখন দেখেছি তখন চাঁদ দেখার অভ্যাসে তাকে আকাশে দেখেছি মনে হলেও, এই প্রথমবার মনে হলো উজ্জ্বল গোলকটা যেন ঠিক আকাশে ছিল না।
পরে পার্লিয়াও উঠে এলো। ও-সহ আরও অনেকটা সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিলাম সেই জোলো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।
সঙ্গ পেয়ে রক্ত কালো করা আতঙ্কবোধ চলে গিয়ে কেমন একটা ক্ষোভ গাঢ় হচ্ছিল আমার ভেতর। মনে হচ্ছিল কেউ বুঝি আমার ওপর অজ্ঞতার অপমান চাপিয়ে দিয়ে চলে গেছে।
কেউ কি সত্যি এসেছিল? যদি এসে থাকে তো কেমন তার জগৎ?

২.
আমার দিনরাতের চক্র বেশ কিছুদিন হলো বদলে গিয়েছিল। রাতের ঘুম আসত পরদিন সকাল ১০টায়।
বিকেল ৩টা বা ৪টার দিকে যখন জাগতাম, কিছুক্ষণ মনে হতো বাইরে সকাল হয়েছে। যখন মনে পড়ত একটা নতুন দিন ঠিকভাবে শুরু করতে আমার বিকেল নেমে গেছে, তখন মনটা একটু খারাপ হতো।
তো ৪টা বাজেই সোনামুখ করে সকাল ৭টার মতো নাশতা করতাম, তারপর লিখতে বসতাম। দুপুরে খেতাম রাত ৮টায়। আর রাতের খাবার খেতে রাত দেড়টা-দুটো বাজত। জানালার বাইরে আকাশ ফর্সা হওয়ার কিছু আগে পাখি ডাকত। তার আগ পর্যন্ত লিখতাম।
ধীরে ধীরে আমার জানালার কাছে পাশের বাড়ির রুক্ষ দেয়াল স্পষ্ট হয়ে উঠত। একসময় পুবের জানালা দিয়ে গরম বাতাস আসত অর্থাৎ বাইরে রোদের আঁচ বেড়ে গেছে।
ধীরে ধীরে আমার সাধ্যশক্তি শেষ হয়ে হলে আবার বিছানার কাছে নিজেকে সমর্পণ। পরের দিন শুরুর নিদ্রাহুতির প্রাক্কালে হয়তো তখন সকাল ১০টা বা তার কাছাকাছি বেজেছে।
সেই চক্র এখন কিছুটা ভেঙেছে। যদিও তার রেশ আছে।
যা হোক, ওই চক্র যখন চলছে তখন এক শুক্রবার ভোর ৪টার কথা। ফজরের আজান হয়নি। লিখছিলাম। থেকে থেকে তন্দ্রামতোন পাচ্ছে।
হঠাৎ কানে একটা বাক্য এলো।
'একটি শোক সংবাদ!'
আমার তন্দ্রা টুটে গেল। আশপাশে কেউ মারা গেলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। আহা রে, এই ভোরে কার আপনজন মারা গেল।
আমি কান ফেলে থাকলাম। কিন্তু ঘোষণা ওই একবাক্যেই থেমে গেছে। বহুক্ষণ আর কোনো সাড়াশব্দ নেই। কে মারা গেছে? ঘোষণা থেমে গেল কেন?
স্বপ্টম্ন দেখে ওঠার পর কিছুক্ষণ যেমন তাকে ভীষণ বাস্তব মনে হয় তারপর ধীরে ধীরে ঘোর কেটে যায়, এখানেও তেমন হলো। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম আসলে কোথাও কোনো ঘোষণা বাজেনি। বাক্যটা শুনেছি আমি তন্দ্রার ঘোরে, বেজেছে আমারই মাথার ভেতর।
শুধু তাই নয়, পুরো বাক্যটা শোনার আগেই শুধু শোক সংবাদ শব্দটা শুনেই আমি চমকে জেগে উঠেছিলাম।
সেদিন একটু আগেই অর্থাৎ সকাল ৮টা নাগাদ বিছানায় শুয়ে পড়লাম। শরীর খারাপ লাগছিল।
বেলা ১২টায় যখন জেগেছি, শুনি মসজিদে মাইকিং হচ্ছে।
'একটি শোক সংবাদ ...'
অবিকল ভোরের সেই কণ্ঠ। আমি চোখেমুখে পানি দিচ্ছি আর ভাবছি, কী কাণ্ড! এ ঘোষণাই বোধহয় মুহূর্তের জন্য তাহলে ভোরে দিচ্ছিলেন মুয়াজ্জিন। পরে কোনো কারণে থেমে গেছেন। তার মানে যা শুনেছিলাম তখন ঠিকই শুনেছিলাম। স্বপ্টম্ন নয়।
ধাক্কাটা খেলাম পুরো বাক্যটা শোনার পর। যাঁর কথা হচ্ছে, সেই ভদ্রলোক আজ সকাল ১০টায় মারা গেছেন।
আমি আয়নার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। পেছনে খাবার টেবিলে আমার মা কিছু সবজি ফালি করছিলেন। বললাম-
'মা, আপনি তো ভোরবেলা জাগেন। কোনো মৃত্যু সংবাদ শুনেছেন তখন?'
'মনে পড়ছে না।'
'এই ঘোষণাওবা কখন থেকে হচ্ছে?'
'এ ১০টা-সাড়ে ১০টা থেকে হচ্ছে। কেন?'
মাকে বললাম সব।

একসময় ভীষণ অসহায় বোধ হতো। কিন্তু সত্যি বলতে কি, সেদিন তেমন কিছুই অনুভব করছিলাম না। কিন্তু রাতে যখন শুনেছি তখন ভয় করছিল, যার প্রভাব শরীরের ওপর পড়েছিল।
ভয় করছিল কারণ এমন আমার নতুন নয়। যখনই কোনো লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, হয় কোনো আভাস পেয়েছি বা স্বপ্টম্ন দেখেছি, আমাকে আতঙ্কিত করে দিয়ে প্রায় হুবহু মিলে গেছে এবং একবার-দু'বার নয়, বারবার।
এমন আভাস পেলেই আমি খানিক আতঙ্কে সময় পার করি। এ আমার ঘুম কেড়ে নেয় মনের স্থিরতা কেড়ে নেয়, আমাকে অবসাদগ্রস্ত করে।
সেদিন ভোর ৪টায় যখন ঘোষণার ভগ্নাংশ শুনতে পেয়েছিলাম, পার্লিয়া সঙ্গে ছিল না, ভেবেছিলাম তখনই ওকে ফোনে একবার জানাই। রিশাদকেও একটা মেসেজ পাঠিয়ে রাখি। পরে নিজেকে নিবৃত্ত করলাম। কারণ যদি জানাই তো ব্যাপারটাকে আগাম স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
পৃথিবী যত রহস্যময়ই হোক আর সেই রহস্যময়তা যত উদ্বাহু হয়েই আমার দিকে ছুটে আসুক, এমন কিছুকে আগাম স্বীকৃতি দেওয়া আমার উচিত হবে না যে স্বীকৃতি আমার উৎকণ্ঠা, স্নায়ুটানটান অদ্ভুত অপেক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
পরে পার্লিয়াকে বললাম-
'তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করছ?'
পার্লিয়া আহত হলো।
'তোমার এসবের সঙ্গে কি আমার পরিচয় নেই? মানুষটা তুমি না হয়ে অন্য কেউ হতো একটা কথা ছিল।'
যখন রিশাদকে বললাম, ও বলল-
'এর লৌকিক ব্যাখ্যা হয়তো আছে। আর অলৌকিক ব্যাখ্যার তো শেষ নেই।'
লৌকিকটাই মানতে চাই। নিশ্চয়ই কোথাও আমার কোনো ভুল হয়েছিল। নিশ্চয়ই কাকতালীয় কিছু ঘটেছিল যেটা আমি অজান্তে এড়িয়ে যাচ্ছি।
রিশাদ বলল-
'সেই চাঁদের ঘটনাটা নিয়ে আমি ঠিক নিঃসন্দেহ হতে পারছি না। শোকের রাত, ক্লান্ত মস্তিস্ক। অনেক কিছুই ঘটতে পারে। কিন্তু এই মৃত্যু সংবাদের ব্যাপারটায় তোমার পক্ষে যাওয়ার মতো কিছু কারণ আছে।'
আমি বললাম-
'ধরো পরিপূর্ণ সুস্থ মস্তিস্কে আছি নিশ্চিতভাবে এমন অনুভব করছে কেউ। তখনও কি মন বিভ্রম তৈরি করতে পারে?'
রিশাদের চিকিৎসক সত্তাকে ওপরনিচ মাথা নাড়তে হলো। কিন্তু ওর লেখকসত্তা বলছিল-
আমি জানি না। ওর চোখে তাই লেখা ছিল।
পার্লিয়া সেই রাত্রে পাশে দাঁড়িয়ে বলছিল-
'মানুষ আত্মার কথা বলে। আমরাও শক্তির রূপান্তরের কথা বলি। এর আগেও কত কত দুঃসহ রাত গেছে, আমরা মৃত্যুও দেখেছি। কিন্তু আজকের মতো দৃশ্য তোমার এই প্রথম চোখে পড়ল। হয়তো রূপান্তরিত শক্তি হয়ে নানাভাই তোমাকে শেষবার দেখা দিয়ে গেলেন।'
শেষ কথা নেই- এই যদি হয় শেষ কথা, তো একটা সত্য প্রকাশ পায়। সেই সত্য হলো- মানুষ কখনোই সত্যটা জানবে না। ইলেক্ট্রনের অবস্থানের মতো সত্যের যথার্থ স্থানাঙ্ক ধরতে গেলেই বদলে যাবে।

বিষয় : আগুনে চাঁদ ও সময়ের ছিন্নমূল ইলেক্ট্রন

মন্তব্য করুন