পদ্মা সেতুর সুফল হিসেবে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়িক সেতুবন্ধ তৈরি হতে যাচ্ছে। এ দুই অঞ্চলের মধ্যে কয়েকটি পণ্য আনা-নেওয়ার মাধ্যমে ব্যবসায়িক সম্পর্ক দীর্ঘদিন থেকে টিকে আছে। তবে এতদিন ফেরি পারাপারের কারণে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। পদ্মা সেতু চালুর ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হলে দুই অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলে আসে এমন পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইলিশ মাছ, নারিকেল, সুপারি, তরমুজ, শীতলপাটি, টাইলস ও মুরগির খাদ্য। উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যায় এমন উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে- লাল আলু, লাল মরিচ ও শাকসবজি। তবে এখন নতুন করে উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যাবে কৃষি যন্ত্রাংশ।

ব্যবসায়ীরা জানান, দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশ বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় দীর্ঘ কয়েক যুগ থেকেই আসছে। বগুড়ায় এমন পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী আগে ছিলেন ১১ জন। এখন আছেন ৭ জন। তাঁরা ইলিশের ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ৩০-৩৫ ট্রাক মাছ নিয়ে আসেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসে বরিশাল জেলা থেকে। ৫ টনের প্রতিটি ট্রাকে ইলিশ আসে প্রায় ৫ হাজার পিস। ট্রাকগুলো বরিশাল, চাঁদপুর, বরগুনা এলাকার ইলিশের মোকাম থেকেই বেশি লোড হয়ে থাকে। ট্রাক লোড হওয়ার পর সেগুলো ফেরি পার হয়ে খুলনা, যশোর কিংবা ফরিদপুর হয়ে উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করে। বিকেলে মাছ ট্রাকে লোড দেওয়ার পর থেকে ট্রাক ছাড়তে শুরু করে। এরপর ফেরি পার হয়ে উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করতে লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। ফেরি ঘাটে ট্রাকের জটের কারণে সিরিয়াল দিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়। অর্থাৎ ফেরি পার হতেই সবচেয়ে বেশি সময় লাগে। ফেরি এলাকায় ট্রাকের জটের কারণে কমপক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা বেশি সময় লেগে যায়। ফেরি ভাড়াসহ প্রতিটি ট্রাকের ভাড়া গুনতে হয় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেতু চালুর ফলে সময় কম লাগবে বিধায় ট্রাকের ভাড়াও ৫-৬ হাজার টাকা কমবে। এতে করে ইলিশ মাছের দামও কিছুটা হলেও কমবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ভোলা থেকে উত্তরাঞ্চলে আসে নারিকেল, সুপারি, মুগ, খেসারি ডাল এবং টাইলস। বিশেষ করে ভোলার নারিকেল ছাড়া যেন চলেই না। প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় কমপক্ষে ১৮ ট্রাক নারিকেল আসে। একেকটি ট্রাকে নারিকেল ধরে ৮০০ পিস। ট্রাকভাড়া দিতে হয় ফেরিচার্জসহ ২৫ হাজার টাকা। ভোলা থেকে ট্রাকে নারিকেল লোড দেওয়ার পর ২ থেকে ৩ দিন লাগে বগুড়ায় পৌঁছতে। এখন সময় ও ভাড়া কম লাগবে।

ভোলার অন্যতম ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী মেসার্স ফ্যাশন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক শাহজাহান মিয়া জানান, ভোলা থেকে নারিকেলের পাশাপাশি মুগডাল, খেসারি ডাল, মুরগির খাদ্য, তরমুজ এবং টাইলস যায় বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে। সব পণ্য মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৫ ট্রাক মালপত্র যায় উত্তরাঞ্চলে। সবচেয়ে বেশি ভাড়া গুনতে হয় তরমুজের ক্ষেত্রে। প্রতিটি তরমুজের ট্রাক ভাড়া বাবদ নেয় কমপক্ষে ৪৫ হাজার টাকা। তরমুজের সময় শুধু তরমুজের ট্রাক যায় প্রতিদিন ১৫-২০টি করে। পদ্মা সেতু হলে সময় কম লাগবে ফলে পণ্যের দাম কমবে।

পদ্মা সেতু চালুর পর কপাল খুলে যাবে উত্তরের ব্যবসায়ীদের। এখানকার উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশ, সবজি, লাল মরিচ আগের থেকে সহজে ও কম খরচে পৌঁছানো যাবে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয়।

জানা যায়, বগুড়া বিসিক শিল্পনগরী ও শহরের শাপলা মার্কেট এবং গোহাইল রোডে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে কৃষি যন্ত্রাংশ। এই যন্ত্রাংশগুলো সড়ক পথে ময়মনসিংহ, সিলেট, জামালপুর, টাঙ্গাইল, ঢাকা, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরের জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক পথ না থাকায় এবং নদীপথের কারণে ওই অঞ্চলে বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ ও কৃষিপণ্য পরিবহনে তেমন সাড়া ছিল না। কিন্তু এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি শিল্পের মালিক শ্রমিকরা।

বগুড়া বিসিকের শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আজিজার রহমান মিল্টন বলেন, আমাদের জেলায় উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশের চাহিদা দেশজুড়েই আছে। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পণ্য পাঠানো হয় না। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় বগুড়ায় উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশের বাজার তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয়।