আশা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন অনেক বন্যার্ত। তবে আবার পানি বাড়ায় হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা এমনই। আবার পানি যে হারে বাড়ছে তাতে বাড়ি ফেরা অনেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন দ্বিতীয়বার আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার। সিলেটের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার চিত্রও একই। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সব হারিয়ে তাঁদের এখন মাথায় হাত।

তাঁদের দুশ্চিন্তা- যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে আবার নতুন করে ঘর কীভাবে বানাবেন!

গত বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দীরগাঁও ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে পানি আর পানি। দূরের বাড়িগুলো আবছা দেখা যাচ্ছে। সড়কের বিভিন্ন স্থান ডুবে গেছে। সড়ক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে স্রোত। স্থানীয় সাংবাদিক সৈয়দ হেলাল আহমদ বাদশাহ জানালেন, এখনও অনেক বাড়িঘর ৭ থেকে ৮ ফুট পানির নিচে। তিনি জানান, এবারের বন্যা তাঁদের অনেক ক্ষতি করে গেছে।

বিকেলে গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের দশগাঁও নওয়াগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের চারটি ভবনে ৩ শতাধিক পরিবার অবস্থান নিয়েছে। কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও চলে গেছেন। তবে এখনও লোকের অভাব নেই।

আশ্রয়কেন্দ্রের দোতলায় কথা হয় নওয়াগাঁও উত্তরপাড়া গ্রামের রাবেয়া বেগমের সঙ্গে। সাংবাদিক শুনেই এক নিমেষেই বলে গেলেন তাঁর না-বলা কথা। বললেন, আমার একটা ঘর ছিল। সুন্দর একটা সাজানো সংসার ছিল। সব তছনছ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম বন্যা শেষ হয়ে গেছে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাই। বাড়ি ফিরে দেখি আমার সব শেষ। একটা বাটিও খুঁজে পাইনি। তার পরও ভেবেছিলাম নতুন করে হাল ধরব। সেটিও আর হলো না।

নতুন করে যে হারে পানি বাড়তে শুরু করল। আবার ঘরের ভেতর পানি চলে এলো। তাই আবার গত ২৪ জুন থেকে আছি আশ্রয়কেন্দ্রে। তাঁর দুশ্চিন্তা- বন্যা শেষ হলে চার সন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন, কী করবেন তার কূলকিনারা পাচ্ছেন না। তার কৃষিজীবী স্বামী তৈয়বুর রহমানের পক্ষে একটি টিন কেনা যেখানে দুস্কর, সেখানে নতুন ঘর বানানো একটা স্বপ্ন।

দ্বিতীয় তলায় কথা হয় জোছনা বেগমের সঙ্গে। উত্তরপাড়ার শামীম আহমদের স্ত্রী তিনি। তাঁর স্বামী একজন দিনমজুর। নিজের একটি বাড়ি আছে। এটিই তাঁদের সম্পদ। বন্যায় সেটিও চলে গেছে। জোছনা বেগম বলেন, প্রথম যখন বন্যা হয় ২১ জুন, তখন তাঁর বাবার বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। এরপর তাঁর বাবার বাড়িতেও পানি উঠে যায়। তখন তিনি আশ্রয় নেন এই কেন্দ্রে। চার-চার দিন থাকার পর বন্যার পানি কমে যাওয়ায় ফের চলে যান বাড়ি। সেখানে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। বাড়ির কোনো চিহ্নই দেখতে পেলেন না। তার পরও হাল ধরবেন ভেবেছিলেন, সেটিও আর হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় দফা বন্যায় আবার তাঁর বাড়িতে পানি উঠে যায়। এরপর আবার ফিরে আসেন আশ্রয়কেন্দ্রে। জোছনা বেগম জানান, শুধু তাঁর নয়; এই বন্যায় তাঁর স্বামীর বাড়ির অনেকের একই অবস্থা হয়েছে। তাঁর ননদ নাছিমার ঘরটিও ভেসে গেছে পানির তোড়ে। একইভাবে মইবুল, আমিন, জাহাঙ্গীর, হেলালসহ তাঁর বাড়ির অনেকেই বাড়ির কোনো নাম নিশানাও নেই বলে জানান নাছিমা।

একই আশ্রয়কেন্দ্রে কথা হয় উত্তরপাড়া গ্রামের জসীম উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁরা প্রথম দফা ২২ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল পাঁচ পরিবার। ২৮ জুন গিয়ে দেখেন বাড়ির নাম-নিশানা নেই। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন নতুন করে বাড়ি সাজাবেন। সেটিও আর হয়ে ওঠেনি। আবারও ঘরের মধ্যে কোমরপানি হয়ে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন এই কেন্দ্রে।

আশ্রয়কেন্দ্রের পাশেই কথা হয় মাঝপাড়া গ্রামের রাজা মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে আমাদের বেশ কয়েকটি পরিবার ছিল। পানি কমে যাওয়ায় বাড়ি চলে যাই। উত্তরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি যে হারে বাড়ছে তাতে আবার আমাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যে কোনো সময় আসার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বলেও জানান রাজা মিয়া।

কথা হয় এলাকার প্রবীণ মনোহর আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, '৮৮, '৮৪, ২০০৪ সালেও বন্যা হয়েছে। কিন্তু আমাদের এলাকায় এমন পানি হয়নি। এবারের বন্যাকে তিনি 'স্মরণকালের ভয়াবহ' আখ্যা দিলেন। জানান, তাঁর ঘরেই গলাপানি ছিল।

এবারের বন্যায় সিলেট জেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির একটি তালিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, সিলেট সিটি করপোরেশন ছাড়া জেলার ১৩টি উপজেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৪০ হাজার ৯১টি কাঁচা ঘর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট জেলা স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যাকবলিত হয়। সিটি করপোরেশনসহ ১৩টি উপজেলা ও পাঁচ পৌরসভা প্লাবিত হয়। জেলার প্রায় ৩০ লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েন। এ পর্যন্ত জেলার ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৪ জন লোক আশ্রয় নেন। প্রত্যক্ষভাবে গ্রামীণ জনপদের ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৩টি পরিবার বিভিন্নভাবে ঘরবাড়ি ভেঙে ও ফসল নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।