বিশ্বে খাদ্য সংকটে খাদ্যের ফলন বাড়াতে আশীর্বাদ হয়ে কাজ করছে বাংলাদেশি তরুণ রিজভী আরেফিনের 'ভ্যাজিস আর আস'। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের জন্য পেয়েছেন পেপসিকো ফাউন্ডেশন এবং ওআরএফ আমেরিকা এক্সপো ২০২০ ফেলোশিপ। তাঁর আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'অ্যাওয়ারনেস ৩৬০'-এর মাধ্যমে পেয়েছেন ফোর্বস, ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক সম্মাননা।

ভ্যাজিস আর আস
বর্তমান বিশ্বে খাদ্য সংকট ব্যাপক। বিশেষ করে করোনার ধাক্কা কাটিয়ে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ উন্নয়নশীল দেশের পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর খাদ্যগুদামেও যেন হলুদ বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে! ফলে শুরু হয়েছে হাহাকার। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কমছে খাদ্য উৎপাদন, এমন সময়ে খাদ্যের ফলন বাড়াতে কাজ শুরু করেছে রিজভী আরেফিনের ভ্যাজিস আর আস। এটি মূলত স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোপনিক্স চাষপ্রকল্প। এই প্রকল্প এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রিজভী বলেন, 'ভ্যাজিস আর আস যে কোনো আবহাওয়া উপযোগী স্মার্ট খাদ্য উৎপাদন সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। আমাদের আছে হাইড্রোপনিক টাওয়ারে ব্যবহূত ভ্যাজিস ফ্ল্যামেল ওএস; যা একটি সঠিক টাইম মনিটরিং ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ফলন বাড়াতে ও উদ্ভিদের রোগ দ্রুত শনাক্তে কাজ করে। এর ফলে টমেটো থেকে শুরু করে স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি নির্ভেজাল এবং সাশ্রয়ী দামে উৎপাদন সম্ভব। এতে যেমন কৃষকের খরচের পরিমাণ কমে আসে, তেমনি অধিক ফলনে সবার জন্য নিশ্চিত করা যাবে পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা। বর্তমানে প্রজেক্টটি পাকিস্তানের আজমো এগ্রিটেক পার্কের সঙ্গে ৩৫ হাজার ডলারের চুক্তির অধীনে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও খুব শিগগিরই বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। আসলে আমরা এমনভাবে এর পরিকল্পনা করেছি, এর মাধ্যমে সহজেই সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।'

২০২০ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১০ দশমিক ৩ ভাগ মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে, যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার সবচেয়ে বেশি- ১৯ দশমিক ৯ ভাগ। এর পেছনে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি বিশ্বের বড় একটি অংশের খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকির উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলেছে। তবে নিশ্চয়ই এ উদ্বেগ কাটিয়ে ওঠা যাবে ভ্যাজিস আর আসের হাত ধরে।

অ্যাওয়ারনেস ৩৬০ ও রিজভীর শুরু
অ্যাওয়ারনেস ৩৬০। আন্তর্জাতিক এই এনজিও পরিচিত তরুণদের কাছে। অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাও রিজভী আরেফিন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই রিজভীর সামাজিক কাজের পথচলা শুরু। ২০১৪ সালের অক্টোবরে শমীর সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করে গড়ে তোলেন সেবামূলক এ সংস্থা। শুরু থেকেই হাত ধোয়া, স্যানিটেশন সচেতনতা, বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লাখ মানুষকে নিয়ে কাজ করে সাড়া ফেলে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ২৩ দেশের ১৬ থেকে ২৭ বছর বয়সী প্রায় ১ হাজার ৫০০ তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে নিজেদের উদ্যোগ পরিচালনা করছে অ্যাওয়ারনেস ৩৬০। রিজভীর শৈশব কেটেছে ঢাকার বোর্ডিং স্কুলের চার দেয়ালে। ছিলেন অনেক দুরন্ত, নিয়মিত অংশ নিতেন বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে। স্কুল, কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুদিন পর চলে যান মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি পুত্রাতে। সেখানেই পরিচয় বাংলাদেশি আরেক শিক্ষার্থী শমীর সঙ্গে। দু'জনেই কাজ করতে চান দেশের জন্য, মানুষের জন্য; এভাবে দু'জনের চিন্তা-ভাবনা মিলে যাওয়ায় দু'জনে মিলে গড়ে তোলেন অ্যাওয়ারনেস ৩৬০।

ব্যস্ততা
ভ্যাজিস আর আস এবং অ্যাওয়ারনেস ৩৬০ ছাড়াও রিজভী কাজ করছেন জাতিসংঘের গ্লোবাল কমপ্যাক্টে টার্গেট জেন্ডার ইকুয়ালিটি প্রোগ্রামের উপদেষ্টা হিসেবে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক্সচেঞ্জ অ্যালামনাই হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন রিজভী। এ ছাড়া কমনওয়েলথ ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড বিচারক প্যানেলের অফিসিয়াল সদস্যও এই তরুণ। তাছাড়া প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন দেশে।

যত অর্জন
জাতিসংঘের এসডিজি নিয়ে বিশ্বের ২৩টি দেশে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করে ২০২১ সালে সহ-প্রতিষ্ঠাতা শমীকে নিয়ে রিজভী উঠে এসেছেন ফোর্বসের প্রভাবশালী তরুণের তালিকায়। ফোর্বস ২০২১ সালের সামাজিক প্রভাব শ্রেণির তালিকায় তাঁদের তুলে ধরেছে 'ফিচারড অনারারি' হিসেবে। এ ছাড়া পেয়েছেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড এবং মালয়েশিয়া থেকে পুত্রা আইকন স্বীকৃতি। এ ছাড়াও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডে। প্যানেলিস্ট হিসেবে। নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আয়োজনে।

আগামীর স্বপ্ন
বিশ্বের চরম খাদ্যের সংকট মোকাবিলা ও খাদ্যের ফলন বাড়াতে নিজেদের কাজ নিয়ে এই স্বপ্নবাজ তরুণ বলেন, 'তরুণদের কাছেই আছে বিশ্ব বদলে দেওয়ার অদম্য শক্তি। আমাদের স্বপ্ন, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে ভ্যাজিস আর আস। হয়তো এই যাত্রা সহজ নয়। তবে এ সমস্যা যত বড়ই হোক না কেন, একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে আমরা সহজেই এই কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করে বাংলাদেশকেও অনন্য এক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারব।' ভ্যাজিস আর আস এবং অ্যাওয়ারনেস ৩৬০কে ঘিরে রয়েছে রিজভীর রাজ্যের পরিকল্পনা। এ ছাড়া ২০৩০ সালের বৈশ্বিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়েও এই প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত করছে। রিজভীদের হাত ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা