২ নম্বর টার্মিনাল গেট দিয়ে ঢুকে কলেজ শিক্ষক শহিদুল হক পরিবার নিয়ে ওঠেন সুন্দরবন-১১ লঞ্চে। মা-বাবার সঙ্গে কোরবানির ঈদ করতে ওই লঞ্চে চেপে গত রোববার সদরঘাট থেকে বরিশালের পথে যাত্রা। সদরঘাট পৌঁছাতে রাজধানীর ভেতর যানজটের পেরেশানিতে পড়লেও লঞ্চে উঠে বেশ ফুরফুরে তিনি। লঞ্চ ছাড়ার আধাঘণ্টা আগে এসে ডাবল কেবিন পাওয়া যাবে- এটা ছিল তাঁর কল্পনার বাইরে।

শহিদুল বলেন, 'সাধারণত ঈদের আগে অগ্রিম টিকিটই পাওয়া যায় না। মাত্র আধাঘণ্টা আগে এসে কেবিনের টিকিট পাব- এটা ভাবিনি। লঞ্চঘাটে আসার আগে ভেবেই নিয়েছিলাম, ডেকে বা ছাদে যেতে হবে। ভাগ্যক্রমে কেবিন পেয়ে গেছি। আরামে যেতে পারব।'

আরেক যাত্রী ঝুমুর পারভীন; দুই মেয়েকে নিয়ে ঝালকাঠির পথে। ওঠেন এমভি ফারহান-৭ লঞ্চে। লঞ্চ ছাড়ার এক ঘণ্টা আগে ঘাটে আসেন। জায়গা করে নেন প্রথম ডেকেই। তিনি বলেন, 'যাত্রীর চাপ কম থাকায় প্রথম ডেকেই জায়গা পেয়েছি। ঈদের আগে এমনটা কখনও ঘটেনি। শুনেছি, লঞ্চে যাত্রী কম। তাই ইচ্ছা করেই দেরিতে বের হয়েছি বাসা থেকে।'

তবে শহিদুল হক ও ঝুমুর বেগমের মুখে হাসি থাকলেও কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে লঞ্চ-সংশ্নিষ্টদের। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বেড়েছে বাস ও রেল কাউন্টারে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকিট পেতে হিমশিম খেলেও সদরঘাটের ছবি পুরোটাই উল্টো।

হাঁকডাকের পরও প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছে না সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চ। বিলাসবহুল বেশিরভাগ লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে। সাধারণ লঞ্চগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। অনেক লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে চার ভাগের এক ভাগ যাত্রী নিয়ে। ডেকের যাত্রী ধারণক্ষমতার অর্ধেক বা তার কিছুটা বেশি হলেও নাজুক অবস্থা কেবিনে। অর্ধেকের বেশি খালি কেবিন নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে লঞ্চ। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার থেকে কিছুটা কমিয়ে রাখলেও মিলছে না যাত্রী। রোববার সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া কয়েকটি লঞ্চে ছিল এমনই যাত্রী সংকট। পদ্মা সেতুর কারণেই লঞ্চে যাত্রীখরা চলছে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

রোববার রাত ৮টায় সদরঘাট থেকে বরিশাল-ঝালকাঠির উদ্দেশে ছেড়ে যায় লঞ্চ এমভি ফারহান-৭। লঞ্চটি ঘুরে দেখা যায়, যাত্রী তুলনামূলক কম। ঈদ উপলক্ষে নেই কোনো চাপ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেকের ধারণসংখ্যা প্রায় ৪৫০, তবে যাত্রী আছেন মাত্র ১৫০। ৩৪ সিঙ্গেল কেবিনের মধ্যে বুকিং হয়েছে ১৬টি। ২২টি ডাবল কেবিনের মধ্যে বুকিং হয়েছে ১১টি। ভিআইপি আটটি কেবিনের বিপরীতে যাত্রী দেখা গেছে তিনটিতে। লঞ্চটির কর্মী সুমন আহমেদ জানান, সেতু চালুর আগে ও দু'দিন পর পর্যন্ত স্বাভাবিক যাত্রী ছিল, তবে কয়েক দিন ধরে যাত্রী নেই বললেই চলে। কম সময়ে পদ্মা সেতু দিয়ে মানুষ যাতায়াত করছে বেশি। ঈদের কোনো আমেজ নেই ঘাটে।

ঢাকা-বরিশাল পথে চলাচল করে পারাবত-১২ লঞ্চ। লঞ্চটির পরিদর্শক আবুল বারেক জানান, অন্য ঈদে এই সময়ে যাত্রীদের চাপ থাকে অনেক বেশি। এবারের চিত্র উল্টো। লঞ্চ আশানুরূপ যাত্রী পাচ্ছে না। যেখানে দু-তিন দিন আগে কেবিন বুকিং দিয়ে রাখেন যাত্রীরা, সেখানে হাঁকডাকেও তা ভরানো যাচ্ছে না।

ভাড়া স্থিতিশীল :ঈদের আগমুহূর্তে যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার থেকে অন্যবার ৫০-১০০ টাকা বেশি রাখলেও এবার তা স্থিতিশীল। যাত্রী কম, তাই নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। তবে লঞ্চ ছাড়ার আগমুহূর্তে কেবিনের ভাড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকা কম রাখতে দেখা যায়। পারাবত-১২ লঞ্চে সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার থেকে ২০০ টাকা কমিয়ে ৮০০ টাকা, ডাবল কেবিন ২ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় হাঁকডাক দেন তাঁরা। একই অবস্থা দেখা যায় এমভি পূবালী ও মর্নিংসান লঞ্চেও। তবে ঢাকা-বরিশাল পথে এখনও ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত আসেনি সরকার ও মালিকপক্ষ থেকে।

অগ্রিম টিকিটে চাপ নেই :ঈদুল আজহা উপলক্ষে সব টার্মিনালে ঈদের দু-একদিন আগের দিনের অগ্রিম টিকিটের চাপ থাকলেও সদরঘাটে নেই। একাধিক লঞ্চে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী বৃহস্পতিবার ছাড়া অন্য দিনের অগ্রিম টিকিটের কোনো চাপ নেই।

যাত্রী কমলেও এখনই ভাড়া কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সহসভাপতি বদিউজ্জামাল বাদল। তিনি বলেন, 'আমরা বুঝতে পারছি, যাত্রী অনেক কমে গেছে। তবে এখনই ভাড়া কমানোর চিন্তা নেই।'

এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক শহিদুল্লাহ বলেন, 'আমরা লক্ষ্য করেছি, প্রত্যাশিত যাত্রী নেই ঘাটে। এ মুহূর্তে কিছু করার নেই।'