১৯৮১। রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় কাদের হোমিও হল। সেখানের এক সামান্য কর্মচারী নুরুল আমিন। চাকরি করতে করতেই মাথায় এলো ব্যবসার চিন্তা। ১৯৯১ সালে হেনোলাক্স নামে খুললেন একটি কোম্পানি। চাকরির পাশাপাশি শুরু হলো ব্যবসা। আরও চার বছর পর ১৯৯৬ সালে অবশেষে দীর্ঘ ১৫ বছরের চাকরিটি তিনি ছাড়লেন। এরপর বেশ পরিচিতি পায় তার হেনোলাক্স কোম্পানি।  

সফল উদ্যোক্তার অনন্য উদাহরণ হতে পারতেন হেনোলাক্সের কর্ণধার নুরুল আমিন। কিন্তু ব্যবসায় আর্থিক সাফল্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা তার নাম, সততা ও সৎ ইচ্ছা। তার 'অভাবে' আমিন আজ সস্ত্রীক গ্রেপ্তার। গ্রেপ্তার হয়েছেন তারই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা এক ব্যবসায়ী নিজের গায়ে আগুন দিয়ে মারা যাওয়ার পর। এই মৃত্যুতে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি। 

নিহত ব্যবসায়ীর নাম গাজী আনিস। তার ভাই আবদুর রশিদ বলেন, আমার ভাইয়ের মতো আরও অনেককে পথে বসিয়েছেন হেনোলাক্সের মালিক। মুনাফার লোভ দেখিয়ে তার কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর টাকা ফেরত চাইলে মিথ্যা মামলা ও হয়রানি করতেন এই অসৎ ব্যবসায়ী। 

গাজী আনিস সোমবার বিকেল ৫টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

আনিসের মৃত্যুর পর গতকাল মঙ্গলবার শাহবাগ থানায় মামলা করেন তার আরেক ভাই নজরুল ইসলাম। আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে করা এই মামলায় আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমাকে আসামি করা হয়। গতকাল রাতে তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানায় র‍্যাব। 

আজ বুধবার দুপুরে এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন হয় কারওয়ার বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে। সেখানে গাজী আনিসের সঙ্গে আমিন-ফাতেমা দম্পতির ব্যবসায়িক লেনদেন ও বিনিয়োগসহ সার্বিক বিষয়ে কথা বলেন র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। 

হেনোলাক্স গ্রুপের কর্ণধার নুরুল আমিনের ব্যবসা শুরুর বিস্তারিত উল্লেখ করে তিনি জানান, ১৯৯১ সালে হেনোলাক্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা শুরু করেন আমিন। পরবর্তীতে কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রাখেন আমিন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। ওই কোম্পানির অধীনে হেনোলাক্স কসমেটিকস্ যেমন- হেনোলাক্স কমপ্লেকশান ক্রিম, হেনোলাক্স স্পট ক্রিম, হেনোলাক্স মেছতা আউট ক্রিম ও হেনোলাক্স হেয়ার অয়েল এবং পোল্ট্রি ফার্মের ব্যবসা করেন। পরবর্তীতে বাজারে হেনোলাক্সের চাহিদা কমে গেলে ২০০৯ সালে আমিন হারবাল নামে কোম্পানি খুলে ব্যবসা শুরু করেন। ২০১৬ সালে হেনোলাক্সের ব্যবসা বন্ধ করে দেন তিনি। 

বর্তমানে লভ্যাংশসহ আমিন দম্পতির কাছে তিন কোটিও বেশি টাকা গাজী আনিসের পাওনা বলে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আমিন দম্পতির কাকরাইলে একটি ফ্ল্যাট, পুরানা পল্টনে স্কাই ভিউ হেনোলাক্স সেন্টার নামে একটি ১০ তলা ভবন, পিংক সিটিতে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি, মেরাজনগর কদমতলীতে হেনোলাক্স নামে চারতলা ভবন এবং মোহাম্মদবাগ কদমতলী এলাকায় হেনোলাক্স ফ্যাক্টরি রয়েছে। 

মামলা ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে নুরুল আমিন ও তার স্ত্রী ফাতেমা আমিনের সঙ্গে পরিচয় হয় গাজী আনিসের। ধীরে ধীরে সখ্যতা ও আন্তরিকতা গড়ে ওঠে। ২০১৮ সালে চিকিৎসার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশে গেলে সেখানে স্থানীয় একটি আবাসিক হোটেলে তারা একসাথে অবস্থান করেন। এ সময় হেনোলাক্স কোম্পানিতে বিনিয়োগের জন্য আনিসকে প্ররোচিত করেন আমিন দম্পতি। 

আনিস প্রথমে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে আরও ২৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। অধিকাংশ টাকাই তিনি ঋণ হিসেবে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার নিয়েছিলেন। বর্তমানে লভ্যাংশসহ গাজী আনিসের ন্যায্য পাওনা তিন কোটি টাকার অধিক বলে জানা যায়। 

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

নিজের শরীরে আগুন দেওয়ার আগে টাকার দাবিতে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও মামলা করেছিলেন আনিস। ফেসবুকে হেনোলাক্সের প্রতারণার বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়েও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এত কিছুর পরও কারও টনক নড়েনি। 

এজাহার সূত্রে আরও জানা যায় যে, গত সোমবার গাজী আনিসের টাকা পরিশোধের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তা পাননি। আমিন দম্পতির আচরণে হতাশ হয়ে বিকেল ৫টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন আনিস। তার শরীরে আগুন দেখে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে গিয়ে আগুন নেভান। কিন্তু তার আগে পোশাক সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া তাকে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের ভর্তি করানো হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টা ১০ মিনিটে মৃত্যু হয় আনিসের।

জানা গেছে, গাজী আনিস কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঠিকাদারী ব্যবসার পাশাপাশি একটি টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে কুষ্টিয়ায় গাড়ির ব্যবসা শুরু করেন। তিনি সাহিত্য চর্চা করতেন এবং তার বেশ কয়েকটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে।