সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মা ও বোনের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আর এদিকে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে ১৮ মাসের শিশু। সব প্রস্তুতি শেষ করে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মা ও বোনের মরদেহ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। ঠিক এই সময়েই খবর এলো ১৮ মাসের সেই শিশুও মারা গেছে।

অবশেষে মমতাময়ী মা ও বড় বোনের সঙ্গে তাকেও পাঠানো হয় লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়িতে। বুধবার দুপুরে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এমন দৃশ্যে চোখের কোণে এক বিন্দু হলেও পানি জমেছে সকলের। একসাথে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় বাকরুদ্ধ বাবা, আর হতভম্ব সবাই।

পরিবার-স্বজন ও উপস্থিত সকলেই বলাবলি করছিল, ১৮ মাসের শিশুর সঙ্গে মায়ের গভীর সম্পর্কটা থাকা স্বাভাবিক। ছোট ভাইকে খুব বেশি ভালোবাসতো বড় বোন। হয়তো এই ভালোবাসার টানে মা ও বোনকে আলাদা করে যেতে দিতে চায়নি ১৮ মাসের শিশু সাইফুল ইসলাম নাসরুল্লাহ। প্রাণহীন দেহেই মা ও বোনের সাথে বাড়ির পথে সেও যেতে চায়! অবশেষে মায়ের সাথে গেছেও সে। আর তাদের পাশাপাশি কবরেই দাফন করার প্রস্তুতি নিয়েছে পরিবার।


ঈদের ছুটিতে দাদা-দাদির সঙ্গে ঈদ করবে তারা। এমন আনন্দে কয়েকদিন ধরেই আনন্দিত ছিল ফাইমা। তর যেন তার সইছিল না। ছোট ভাইকে নিয়ে দাদা-দাদির সঙ্গে কত মজা করবে এই যেন পরিকল্পনা ছিল সবসময়ের। বড় মেয়ের খুশিতে বাবা-মাও যেন ছিল উচ্ছ্বসিত। অবশেষে দাদা-দাদির বাড়িতে ছোট ভাইকে নিয়েও গেল সে, তবে প্রাণহীন দেহে। সাথে প্রাণহীন দেহে মমতাময়ী মাও গেল তাদের সঙ্গে।

হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করলেও তেমনটা গুরুতর নন বাবা মোহাম্মদ হোসাইন। তবে এমন ঘটনায় তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কারও সঙ্গে ভালোভাবে কথাটুকুও বলতে পারছেন না। তার চোখে-মুখে যেন দৃশ্যহীন চাহনি। অনেক কিছু বলতে চান, কিন্তু কিছুই যেন মুখ থেকে বের হচ্ছে না। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহের দিকে।

পরিবারের সূত্রে জানা যায়, বিরল উপজেলার তেঘরা দারুল হাদীস সালাফিয়্যাহ মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোসাইন ২১ বছর ধরে এই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। বিবাহিত জীবনে তিনি এক মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। সবচেয়ে বড় মেয়ে ফাইমার বয়স ১৩ বছর। দ্বিতীয় সন্তান হেদায়েতুল্লাহর বয়স ৭ বছর। আর তৃতীয় ছেলে নাসরুল্লাহর বয়স ১৮ মাস।

তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার পাঁচটিকরি গ্রামে। ছোট ভাই মোহাম্মদ হাসান, স্ত্রী, এক মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার তেঘড়া এলাকায় বসবাস করেন তিনি। ছোট ভাই মোহাম্মদ হাসান দিনাজপুরে লেখাপড়া করেন। এবারের ঈদের পরিকল্পনা ছিল গ্রামে গিয়ে সকলের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন।


পরিকল্পনা থাকলেও যাতায়াতের জন্য একটি মোটরসাইকেলে করে ৫ জন যাওয়া অসম্ভব। তাই দ্বিতীয় সন্তানকে ছোট ভাইয়ের কাছে রেখে বুধবার ভোরে রওয়ানা দেন তিনি। সঙ্গে নেন স্ত্রী, বড় মেয়ে ও তৃতীয় সন্তানকে। মোটরসাইকেলযোগে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে একটি তেলবাহী লরি পেছন থেকে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়।

এতে পরে গিয়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই স্ত্রী বিউটি বেগম (৩০) ও মেয়ে ফাইমা আক্তার (১৩) নিহত হয়। পরে আহত বাবা হোসাইন ও ছেলে সাইফুল ইসলাম নাসরুল্লাহকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশু নাসরুল্লাহর মৃত্যু হয়।

মাদ্রাসার কোষাধ্যক্ষ আবুল খায়ের বলেন, আমরা মা ও মেয়ের মরদেহ নিয়ে হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছিলাম গ্রামে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে। প্রথমে মেয়ের মরদেহ তুলি, এরপরে মায়ের মরদেহ তুলছিলাম। এরই মধ্যে খবর আসে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশু নাসরুল্লাহ মারা গেছে। এ সময় সবাই হতভম্ব হয়ে পড়ি। কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষক মোহাম্মদ হোসাইন। এমন খবর আসার সাথে সাথেই আমরা কেউই কান্না ধরে রাখতে পারিনি।

তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকেই মোহাম্মদ হোসাইন এখানে শিক্ষকতা করছেন। ১৪-১৫ বছর আগে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে এখানেই থাকতেন। বাড়িতে যেতে হলে মোটরসাইকেল নিয়েই যেতেন। মঙ্গলবার রাতেও আমার কাছ থেকে ১৩ হাজার ৬০০ টাকা বেতন নিয়েছেন। আমার কাছে দোয়া নেন, বিদায় নেন। বলেন, ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসবেন।

মোহাম্মদ হোসাইনের ভাই হাসান বলেন, আমি নিজেও দিনাজপুরে পড়ালেখা করি। আমার কাছেই ভাতিজা হেদায়েতুল্লাহকে রেখে তারা মোটরসাইকেলযোগে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ভোরে নামাজ পড়ার পরই তারা রওনা দেন। এরপর সকালে দুর্ঘটনার সংবাদ পাই। তাদের মরদেহ পাশাপাশি কবর দেওয়া হবে।