রাজধানীর তুরাগে রিকশা গ্যারেজের পাশে ভাঙাড়ি দোকানে বিস্ফোরণে দগ্ধ আটজনের মধ্যে একে একে মৃত্যু হয়েছে সাতজনেরই। একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তার অবস্থা সংকটাপন্ন। এই আটজনের মধ্যে সাতজনই দরিদ্র পরিবারের; পেশায় রিকশাচালক। রিকশা গ্যারেজ মালিক টেনেটুনে চলতে পারলেও সংসারে ভিন্ন কেউ উপার্জনের না থাকায় পরিবারটিও পড়েছে বিপাকে। গ্যারেজের মিস্ত্রি আলমগীর ওরফে আলম মিয়া তার পালক ছেলে ছিলেন। ওই বিস্ফোরণে মারা গেছেন তিনিও।

নিহত ব্যক্তিদের হতভাগ্য পরিবারগুলো চিকিৎসা থেকে শুরু করে লাশ দাফন পর্যন্ত ঋণে জর্জরিত। এই ঋণ শোধ করবেন কীভাবে, তাও জানেন না তারা। এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। ধার করে, চাঁদা তুলে চিকিৎসা আর দাফন করা হয়েছে।

তুরাগের কামারপাড়া এলাকায় গাজী মাজহারুল ইসলামের রিকশা গ্যারেজের পাশেই ছিল তার মালিকানাধীন ভাঙাড়ি গুদাম। গত শনিবার বিভিন্ন রাসায়নিকের পরিত্যক্ত বোতল স্ক্র্যাপ মেশিনে চাপ দিয়ে ভাঙার সময় বিস্ফোরণে তারা হতাহত হন। পরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হলে গ্যারেজ মালিক মাজহারুলসহ গত কয়েক দিনে তারা মারা যান।

নিহত নুর হোসেনের ছেলে নাজমুল ইসলাম বলেন, বাবার রিকশার প্যাডেল না ঘুরলে সংসার চলত না। বাবা দগ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা ও দাফনে ৪৩ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। এর মধ্যে তারা কামারপাড়ার যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেই বাড়ির মালিক উদ্যোগী হয়ে লোকজনের কাছ থেকে তাকে ২৪ হাজার টাকা চাঁদা তুলে দিয়েছেন। বাকি টাকা ধার করে বাবার লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ গেছেন।

গ্যারেজ মালিক মাজহারুলের কোনো ছেলে নেই। তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে বীথি আক্তার উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। বাবার ইচ্ছা পূরণে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল তার। যেদিন গ্যারেজে বিস্ফোরণ হলো, সেদিনই বাবার কাছ থেকে ১২ হাজার ৮০০ টাকা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি ফরম পূরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বীথি। পথেই দুঃসংবাদ পেয়ে ফিরে আসেন। শেষ পর্যন্ত মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির টাকা দিয়ে দাফন করতে হলো বাবাকে।

বুধবার উত্তরা ইউনিভার্সিটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তারা বীথিকে ইংরেজি বিভাগে চার বছর মেয়াদি অনার্স প্রোগ্রামে বিনামূল্যে পড়াশোনা করার ব্যবস্থা করেছে।

নিহত আলমগীরের শ্বশুর রবিউল ইসলাম সমকালকে বলেন, মাসতিনেক আগে আলমগীরের সঙ্গে তাঁর মেয়ে স্বর্ণালী আক্তার হাফসার বিয়ে হয়। এখন পরিবারটি কীভাবে চলবে, তার মেয়ের কী হবে- তা বুঝতে পারছেন না।

ভয়াবহ এই বিস্ফোরণের পর বিপাকে পড়েছেন রিকশাচালক মিজানুরের স্ত্রী জহিরুন আক্তার। স্বামীর মৃত্যুতে সাত মাসের এই সন্তানসম্ভবা নারী পড়েছেন মহাবিপদে।

তুরাগ থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার কারণ তারা অনুসন্ধান করছেন। এ জন্য ফায়ার সার্ভিসের মতামতের অপেক্ষায় রয়েছেন। হতাহত পরিবারগুলো দরিদ্র হওয়ার পরও মালিকপক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাচ্ছে না। কারণ, গ্যারেজ মালিকও ওই বিস্ফোরণে মারা গেছেন।