আসাদুল্লাহ দুদু একটি কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন সাইকেলে করে ব্যাংকের চেকবই ডেলিভারি দেন। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। মাসে বেতন ১৪ হাজার টাকা। টানাপোড়েন থাকলেও স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে থেমে ছিল না সংসারের চাকা। সাপ্তাহিক ছুটিতে গ্রামে যেতেন বাবা-মায়ের কাছে কিংবা ছেলের সঙ্গে অবসর কাটাতেন। তবে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি তাঁর এই সুখ কেড়ে নিয়েছে। এখন আর তাঁর অবসর নেই। নিজের সাইকেল মেরামতের অভিজ্ঞতা পুঁজি করে ছুটির দিনে রাজধানীর ধানমন্ডির ফুটপাতে অন্যের সাইকেল মেরামত করছেন বাড়তি রুজির আশায়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের ১৩/এ সড়কের বিপরীত পাশের ফুটপাতে দেখা হয় জামালপুরের মেলান্দহের তেঘরিয়া গ্রামের এই কুরিয়ার কর্মীর সঙ্গে। বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ তিনি। ৪০ বছরেই চুল-দাড়িতে পাক ধরেছে। দুর্মূল্যের বাজারে কী করে চলছে সংসার- তা নিয়ে হলো দীর্ঘ আলোচনা। সংসার চালানোর খরচের হিসাব শুনিয়ে বললেন, আর চলছে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বাধ্য হয়ে বাড়তি উপার্জনে নামতে হয়েছে। সামান্য অভিজ্ঞতার পুঁজি নিয়ে শুরু করেছি সাইকেল মেরামত। এমন অভাব আগে ছিল না আসাদুল্লাহর। গ্রামে বাবার ১২-১৩ বিঘা ফসলের জমি ছিল। কাপড়ের দোকান ছিল। সাত ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগিতে দোকান হাতছাড়া হয়। ২০০৯ সালে আসেন ঢাকায়। চাকরি নেন একটি কুরিয়ার সার্ভিসে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ। রোজ সকালে মগবাজার থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, মিরপুর, হাজারীবাগ, চকবাজার ঘুরে ১৪টি ব্যাংকের শাখায় চেকবই, ক্রেডিট কার্ড, ডেভিড কার্ড পৌঁছে দেন তিনি। এ কাজে প্রতিদিন ৩০-৪০ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হয়।

২০০৯ সালে এক হাজার ২০০ টাকায় পুরোনো সাইকেল কেনেন আসাদুল্লাহ। নিত্যসঙ্গী সাইকেলটিকে ঠিক রাখতে চাকার লিক সারাই থেকে স্পোক বদল- সব কাজ শিখেছেন দেখে দেখে। কয়েক বছর আগে এক হাজার ৩০০ টাকায় হাওয়া দেওয়ার পাম্পার, রেঞ্জ, হাতুড়িসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনেন। বছরখানেক ধরে বাড়তে থাকা চাল, ডাল, তেল, আটা, ডিম, নুনের দামের ধাক্কায় বেতনের টাকায় সংসার চালাতে না পেরে সেই যন্ত্রপাতি নিয়ে ফুটপাতে বসেছেন পরের সাইকেল মেরামতে। গত ৫ আগস্ট প্রথম দিনে ২১০ টাকা উপার্জন করেন। পরদিন রোজগার হয় ১৬০ টাকা। গতকাল প্রথম ঘণ্টায় মাত্র ২০ টাকা আয় হয়।

আসাদুল্লাহ থাকেন পশ্চিম ধানমন্ডির শংকরে। এক রুমের বাসার ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। রান্নাঘর ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয় অপর দুই ভাড়াটিয়ার সঙ্গে। তাঁর শঙ্কা সেপ্টেম্বরে ওয়াসার পানির দাম বাড়লে ঘর ভাড়াও বাড়বে। কী করে বাড়তি খরচ মেটাবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না। হয়তো স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামে পাঠিয়ে দিতে হবে।

ঘর ভাড়া দেওয়ার পর আসাদুল্লাহর হাতে থাকে ৯ হাজার টাকা। ছেলে ওয়েস্ট আবুল হোসেন স্কুলের কেজি ক্লাসের ছাত্র। মাসিক বেতন ৫০০ টাকা। ছেলের প্রাইভেট শিক্ষকের বেতন ৬০০ টাকা। আসাদুল্লাহর ছোট ভাই মাদ্রাসায় পড়েন। তাঁকে মাসে দিতে হয় ৫০০ টাকা। এই ক'টি খরচ মিটিয়ে হাতে থাকে সাত হাজার ৪০০ টাকা।

আসাদুল্লাহ জানালেন, মাসে দুই হাজার ৮০০ টাকার চাল লাগে। মাছ, সবজি, তেল, নুন, চিনির মতো শুকনা বাজারে যায় আরও ৩০০০ টাকা। ছেলের পুষ্টির জন্য প্রতিদিন একটি ডিম ও দুটি কলা খাওয়াতে হয়। তাতেই মাসে ৬০০ টাকা খরচ হয়। খাবার, ভাড়া ও লেখাপড়ার খরচ মিটিয়ে অবশিষ্ট থাকে এক হাজার টাকা। তা দিয়ে নিজের হাত খরচ, স্ত্রীর খরচ, ছেলের আবদার, বাবা-মায়ের খরচ মেটাতে হয়। জামা-কাপড় কেনা, ওষুধ, ফলমূল জীবন থেকে বাদ গেছে।

আগে মাসে দু'বার বাড়ি যেতেন আসাদুল্লাহ। লোকাল ট্রেনে যাওয়া-আসায় ৩০০ টাকা খরচ হয়। বাবা-মায়ের জন্য এটা সেটা নিতে আরও পাঁচশ-সাতশ টাকা ব্যয় করতেন। খরচের ভয়ে এখন বাড়ি যান না। ৮০ বছরের বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা এবং ৭৫ বছর বয়সী মায়ের মুখ দেখেন না প্রায় তিন মাস। বাবা-মায়ের মুখ দেখতে না পারার কষ্ট বুকে চেপে ছুটির দিনে সাইকেল মেরামত করেন দু'পয়সা বাড়তি রোজগারের আশায়। তাতেও কিছু হচ্ছে না। ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ টাকা কেজি হওয়ার দুঃসংবাদ তাঁকে আরও বিপদগ্রস্ত করেছে।

কোরবানির ঈদে ধনীদের বাড়ি থেকে তোলা গরুর মাংস বিক্রি হয় রাজধানীর সড়কে। মাসখানেক আগে ৫০০ টাকায় সেই মাংস এক কেজি কিনেছিলেন আসাদুল্লাহ। আগামী ১১ মাসে আর মাংস কেনা সম্ভব নয়। তেলের দামের কথা উঠতেই শান্তশিষ্ট আসাদুল্লাহ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, 'কী আর কইতাম! দুই লিটার তেল খুব হিসাব করে খরচ করলেও ২৪-২৫ দিনের বেশি যায় না। দুই কেজি তেলের দাম আছিন ২০০ টাকা। সেই তেল এখন ৪২০ টাকা। এই ২০০ টাকা কোইত্তে আহে।'

শেষ কবে বেতন বেড়েছিল মনে করতে পারলেন না আসাদুল্লাহ। জানালেন, খুব সম্ভবত ২০১৯ সালে ৩০০ টাকা বেড়েছিল। সেই সময়ে এক বস্তা চালের দাম ছিল এক হাজার ৮০০ টাকা। এখন তা দুই হাজার ৮০০ টাকা। হাজার টাকা খরচ বাড়লেও বেতন বাড়েনি এক পয়সা। শাকসবজি, মাছের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, রুজি বাড়েনি। আটার দাম বাড়ায় রুটি বাদ দিয়ে সকালেও ভাত খাচ্ছেন। দুধ, চিনির দামের কারণে চা খান না।

সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে না পারার শঙ্কায় ভোগা আসাদুল্লাহ বললেন, '২৫ টাকা হালির ডিম ৫০ টাকা হইছে। ছেলেরে খাওয়ানোর মধ্যে একটা ডিম দিতাম। সেটাও তো মনে হয় আর পারব না। কী করব ভাই? কই যাব? আমাদের কথা ভাবার তো কেউ নাই।'