সেতু আছে; কিন্তু দু'পাশে রাস্তা নেই। খোলা মাঠে নির্মাণ করা এমন সেতু মাঝেমধ্যেই ব্যাপক কৌতূহল ও সমালোচনার জন্ম দেয়। এমনই এক দায়সারা কাণ্ড ঘটিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করেছে দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার কেন্দ্র। তবে সেখানে পয়ঃবর্জ্য যাওয়ার কোনো পাইপলাইনই নেই। সেই শোধনাগার আবার ব্যাপক আয়োজনে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

ওয়াসার কর্মকর্তারাই বলছেন, শোধনাগারটিতে বর্জ্য যাওয়ার পাইপ নেটওয়ার্ক তৈরি না করায় এর সুফল পাবে না নগরবাসী। এই প্রকল্পের সুফল পেতে নিতে হবে আরেকটি নতুন প্রকল্প। এতে প্রশ্ন উঠেছে, পয়ঃশোধনাগার কেন্দ্র উদ্বোধনের সাড়ম্বর আয়োজন কেন। আগামী ২৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করবেন- এমন প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। উদ্বোধন অনুষ্ঠান সফল করতে শ দেড়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছয়টি কমিটি। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ।

এ বিষয়ে জানতে দাসেরকান্দি প্রকল্পের পরিচালক মোহসিন আলী মিয়াকে বারবার ফোনে দিলেও তিনি ধরেননি। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে ঢাকা ওয়াসার জনতথ্য কর্মকর্তা মোস্তফা তারেক সমকালকে বলেন, 'যাঁরা প্রকল্পটির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছেন। তাঁরা সমাধান দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যমকে জানানোর মতো ম্যাচিউরড অবস্থা হয়নি। সেটা হলে জানাব।'

ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেছেন, দাসেরকান্দির শোধনাগারটিতে বর্জ্য যাওয়ার পাইপ নেটওয়ার্ক তৈরি না করায় এর সুফল পাবে না নগরবাসী। এই শোধনাগারের আওতাভুক্ত এলাকায় পয়ঃনেটওয়ার্ক তৈরি করতে চীনের অর্থায়নে আরেকটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে। তার আগ পর্যন্ত ঢাকায় বিদ্যমান যেসব নেটওয়ার্ক আছে, সেগুলোর সংযোগ দাসেরকান্দিতে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, রাজধানীর বিশাল এলাকার পয়ঃবর্জ্য হাতিরঝিল, গুলশান-বারিধারা-বনানী লেক ও সিটি করপোরেশনের স্যুয়ারেজ লাইনে গিয়ে পড়ে। এসব বর্জ্যের কারণে বিশাল এলাকার পরিবেশ দূষিত হয়। লেক-ঝিলের দূষণ রোধ করা যায় না। এ জন্য গুলশান, বনানী, বারিধারা, বারিধারা ডিওএইচএস, বসুন্ধরা, বাড্ডা, ভাটারা, বনশ্রী, কুড়িল, সংসদ ভবন এলাকা, শুক্রাবাদ, ফার্মগেট, তেজগাঁও, আফতাবনগর, নিকেতন, সাঁতারকুল, হাতিরঝিলসহ আশপাশের এলাকার বর্জ্য দাসেরকান্দি শোধনাগারে পাইপলাইনের মাধ্যমে নেওয়া হবে। সেখানে বর্জ্য শোধন করে বালু নদীতে পানি ফেলা হবে। এতে পরিবেশ দূষণ হবে না। বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানির দূষণ কমানো সম্ভব হবে। আর শীতলক্ষ্যার পানি এনে সায়েদাবাদের দুটি পানি শোধনাগারে শোধন করে নগরীতে সরবরাহ করাও সহজ হয়ে যাবে। এ জন্য দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারের সঙ্গে হাতিরঝিল পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার ডাবল লাইনের ট্রাঙ্ক স্যুয়ার লাইন (মোট ১০ কিলোমিটার) বসানোর কথা প্রকল্পে উল্লেখ আছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকার মধ্যে ওই পাইপলাইন স্থাপনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ওয়াসা পুরো টাকা খরচ করে ফেললেও ১০ কিলোমিটার ট্রাঙ্ক স্যুয়ার লাইন তৈরি করতে পারেনি। এ কারণে দাসেরকান্দি শোধনাগারে বর্জ্য পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ওয়াসার কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতার কারণে অর্থ ব্যয় করেও এ প্রকল্প থেকে সুফল মিলবে না। প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই ওয়াসা জানত পাইপ নেটওয়ার্ক ছাড়া শোধনাগারটি অব্যবহূত অবস্থায় ফেলে রাখলে তা জনগণের কোনো উপকারে আসবে না। এতে বোঝা যায়, এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। এটা জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

২০১৪ সালে ঢাকা ওয়াসা দাসেরকান্দি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রথমে ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৩১৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ৭১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা করা হয়। এর মধ্যে চায়না এক্সিম ব্যাংক ঋণ দেবে ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। বাকি ১০ কোটি টাকা ব্যয় করবে ঢাকা ওয়াসা। এই অর্থেই পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা। এদিকে চায়না এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া ঋণচুক্তির সময়সীমা ছিল ৭ মে ২০২২। সুদের হার ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের দেওয়া ঋণে সুদের হার থাকে ১ শতাংশ। দাসেরকান্দি প্রকল্পে চায়না এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া ঋণের সুদের হার প্রায় আড়াই শতাংশ। এ প্রকল্প থেকে জনগণ সুফল না পেলেও ঋণের কিস্তি ঠিকই ডলারে পরিশোধ করতে হবে ওয়াসাকে। পাশাপাশি পাইপলাইন বসানোর জন্য এখন আরেকটি প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের ঋণের কিস্তি দিলে সেই ডলার আসবে কোথা থেকে। ওয়াসাকে পানির দাম আরও বাড়িয়ে ঋণের কিস্তি দিতে হবে। প্রকল্প সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার দায় দিন শেষে নগরবাসীর ওপর চাপানো হচ্ছে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ। এটা বলে সাড়ম্বরে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিয়েছে ওয়াসা। প্রকল্পটি উদ্বোধন করার পরও যে কোনো সুফল মিলবে না, তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন না।