ক্রেন কাত হয়ে প্রাইভেটকারের ওপর গার্ডার পড়ে পাঁচজনের মৃত্যুতে সমালোচনার মুখে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) ঠিকাদারদের শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো। যদিও অতীতে বারবার ছাড় দেওয়া হয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ধরা পড়েও শাস্তি পেতে হয়নি ঠিকাদারকে। নির্ধারিত সময়ে কাজ না করা, দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টাকার জোগান না থাকা এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের বিল বাকি ফেললেও চিঠি দিয়ে জবাব চাওয়া ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরই (সওজ) ৩২ বার চিঠি দিয়েছে।

গতকাল বুধবার সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরীর সভাপতিত্বে ঠিকাদারদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। এতে বিআরটি প্রকল্পে ঋণদাতা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিনিধিরা ছিলেন। ছিলেন সওজের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান, প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার, ঢাকা বিআরটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সফিকুল ইসলাম, প্রকল্পের তিন অংশের পরিচালকসহ সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

গত সোমবার রাজধানীর উত্তরার জসীম উদ্‌দীন মোড়ে যেখানে গার্ডার পড়ে পাঁচজন নিহত হয়েছেন, বিআরটির সেই অংশের ঠিকাদার চায়না গেঝুবা গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড। সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) অধীনে উড়াল অংশের ঠিকাদার চীনের জিয়াংশু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড।

আগের দিনই সচিব জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক তদন্তে ঠিকাদারের দায় পাওয়া গেছে। প্রয়োজনে গেঝুবাকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে। কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে- তা নিয়ে গতকাল বৈঠকে আলোচনা হয় জানিয়ে মনির হোসেন পাঠান সমকালকে বলেছেন, চুক্তির যেসব শর্ত ঠিকাদার লঙ্ঘন করেছে, তার সাজা দেওয়া হবে।

কী কী শর্ত, কতবার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে ঠিকাদার- এ প্রশ্নে সওজের প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, সেগুলোই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সোমবার জাতীয় শোক দিবসের ছুটিতে চুক্তি লঙ্ঘন করে কাজ করছিল ঠিকাদার। তাদের আগেই চিঠিতে জানানো হয়েছিল, ১৫ আগস্ট কাজ বন্ধ থাকবে। প্রকল্প কর্মকর্তারা শোক দিবসের কর্মসূচিতে থাকবেন। চুক্তি অনুযায়ী, কাজের পরিকল্পনা আগাম জানাতে হবে। ভারী মালামাল স্থানান্তরের সময় যান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। এসব শর্ত মানা হয়নি।
জরিমানা, নাকি ঠিকাদারকে প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হবে- এ প্রশ্নে মনির হোসেন পাঠান সমকালকে বলেছেন, এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা ঠিকাদার চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। ঠিকঠাক তদারকি না করায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কিনা- প্রশ্নে প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, কেউই ছাড় পাবে না।

চীনের ঋণে বাংলাদেশে অনেক প্রকল্প চলছে। বিআরটি সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, চীনা প্রতিষ্ঠানকে সাজা দেওয়া সহজ নয়। বাংলাদেশ-চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভাবতে হয়। সে কারণেই এত দিন জরিমানা করা হয়নি। তবে প্রধান প্রকৌশলী এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি।

তিন প্রকল্পে অনিয়মের কারণে গেঝুবাকে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক দেড় বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করে। বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার ছাড়াও এবিডি, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (জিইএফ) টাকায়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন না থাকায় গেঝুবার বিআরটি প্রকল্পে কাজ পেতে আইনি বাধা ছিল না।
১৭ কিলোমিটার বিআরটি লাইন নির্মাণে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়। ৮৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকায় ৯১৭ দিনে, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ১৬ অক্টোবর কাজ সম্পন্নের শর্ত ছিল। পরে চুক্তির মেয়াদ বাড়ে। গত জুন পর্যন্ত কাজ করেছে মাত্র ৬৫ ভাগ।

৯৩৫ কোটি ১২ লাখ টাকায় বিআরটির উড়াল অংশ নির্মাণে চীনের জিয়াংশুর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়। ৫৩৯ দিনে, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ১ জুন কাজ সম্পন্নের শর্ত ছিল। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও জুন পর্যন্ত তারা কাজ করেছে ৮৫ ভাগ।

প্রকল্পের সওজ অংশের পরিচালক এ এস এম ইলিয়াস শাহ সমকালকে বলেছেন, শুরু থেকেই ঠিকাদারের টাকার সংকট রয়েছে। সে কারণে কাজ বিঘ্নিত হয়েছে। বারবার তাগিদ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চীনা দূতাবাসকে জানানো হয়েছে; কিন্তু ঠিকাদার গা করেনি।

তাগাদা দিলেও চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে না পারায় ঠিকাদারকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। কেন তা করা হয়নি- এ বিষয়ে বিবিএ অংশের প্রকল্প পরিচালক মহিরুল ইসলাম খানের বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।
বিআরটির পরামর্শক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মাহবুবুল বারী সমকালকে বলেছেন, গত জুলাইয়ে দুর্ঘটনার পরই ঠিকাদারকে নিরাপত্তা বিষয়ে করণীয় জানানো হয়। তা মানেনি। নির্মাণ এলাকার সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তায় খরচ করেনি। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়েছে। যদিও তা পরীক্ষায় ধরা পড়ায় নির্মাণসামগ্রী বদল করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান সমকালকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক দরপত্রে কাজ পেয়েছে চীনা ঠিকাদাররা। তারা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন মানতে বাধ্য। তাদের কেন বারবার ছাড় দেওয়া হয়েছে? কারা ছাড় দিয়েছেন? এসব প্রশ্নের জবাব জরুরি। ক্রেনের ক্রলার বা চাকা উল্টে 'টিপিং ফেইল' হয়েছে। যা হতেই পারে। যে কারণেই ক্রেন পরিচালনার সময় রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। বিকল্প ক্রেন ও অপারেটর থাকার কথা। এগুলোর কিছুই ছিল না। ঠিকাদার কাজ শুরুর আগে কর্মপরিকল্পনা দেয় কর্তৃপক্ষকে। কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই এত দিন সে অনুযায়ী কাজ হয়নি। প্রকল্প ৮০ ভাগ হয়েছে। ঠিকাদার বিল পেয়েছেন। এখন বাদ দিলে তাদের লাভই হবে।
দুর্ঘটনার তিন দিনেও নিজেদের বক্তব্য জানায়নি গেঝুবা। প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি লু হোয়াংলিনের ফোন বন্ধ পেয়েছে সমকাল। মনির হোসেন পাঠান জানিয়েছেন, ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

যানজট নিরসনে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার বিআরটি লাইন-৩ নির্মাণ প্রকল্প ২০১২ সালের। প্রথম ধাপে জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দর- সাড়ে ২০ কিলোমিটার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। পূর্ণাঙ্গ নকশা ছাড়াই ২০১৭ সালে কাজ শুরু হয়।

প্রকল্প ব্যয় ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। প্রকল্প মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে ব্যয় ৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা করে ডিপিপির দ্বিতীয় সংশোধনের কাজ চলছে। কিলোমিটারে ২২১ কোটি টাকা খরচ হবে। ঢাকার বিআরটি এ হিসাবে পৃথিবীতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল।