বিআরটি প্রকল্পের ঠিকাদার চায়না গ্যাঝুবা গ্রুপ করপোরেশনের (সিজিজিসি) 'সেফটি ইঞ্জিনিয়ার' জুলফিকার আলী শাহ মাত্র এসএসসি পাস। কারিগরি কোনো শিক্ষা ছাড়াই গত বছর এত বড় প্রকল্পের ওই পদে নিয়োগ পান তিনি। প্রকল্পের বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা থেকে উত্তরার আজমপুর পর্যন্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তাঁর।

উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ১০ জনকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
র‌্যাবের মুখপাত্র আরও বলেন, এত বৃহৎ প্রকল্পে সেফটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার মতো কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ তাঁর নেই। দুর্ঘটনার দিনে ভারী গার্ডার স্থাপনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া হয়নি। গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত জনবলও নিয়োগ করা হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে র?্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত। সেই কাজটি তারা করেনি। তা ছাড়া এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও সংখ্যা কম থাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনাস্থলের দায়িত্বে থাকা চীনা কর্মকর্তাদের কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি- জানতে চাইলে খন্দকার মঈন বলেন, একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করছে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে এ ঘটনায় দায়ী কারা। এ ছাড়া এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে যাদের দায় রয়েছে বা জড়িত রয়েছে তাদেরই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় এখন ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা দাঁড়ালেও র‌্যাবের তথ্য বলছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিয়েই খরচ কমানোর চেষ্টা করে গেছে। দুর্ঘটনাস্থলে যে ক্রেনটি ব্যবহার করা হচ্ছিল, এর বয়স অন্তত ২৬ বছর। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, ওই ক্রেন দিয়ে সর্বোচ্চ ৪৫-৫০ টন পর্যন্ত ভারী কিছু তোলা যায়। আর ক্রেনটি যখন সোজাসুজিভাবে না তুলে তেরছাভাবে তোলা হয়, তখন সেটির ভার বহন সক্ষমতা আরও কমে যায়। সেখানে যে গার্ডারটি ছিল তার আনুমানিক ওজন ৬০-৭০ টন। ফলে ক্রেনচালক নিয়ন্ত্রণ হারান।

র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, 'সাধারণত রাতের বেলায় গার্ডার শিফটিংয়ের কাজ চলে। সেদিন ছুটির দিন হওয়ায় তাদের পর্যাপ্ত লোক ছিল না। পর্যাপ্ত লোক ছাড়াই সেখানে গার্ডার তোলার কাজ চলছিল। ঘটনাস্থলের অদূরে দাঁড়িয়ে কাজ তদারকি করছিলেন চীনা কর্মকর্তারা।

র‌্যাব জানায়, প্রাইভেটকারটি চাপা দেওয়ার সময় ক্রেনটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী রাকিব হোসেন। বাইরে থেকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন মূল ক্রেনচালক আল আমিন হৃদয়। মূল অপারেটর আল আমিনের হালকা গাড়ি চালানোর অনুমোদন থাকলেও ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নেই। ২০১৬ সালে ক্রেন চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে ২-৩টি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করার পর ২০২২ সালের মে মাসে বিআরটি প্রকল্পে যুক্ত হন। ৩ মাস আগে এই প্রকল্পে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন রাকিব। তাঁর ক্রেন চালনার কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছিল না।

র‌্যাব যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা হলেন- ক্রেন অপারেটর আল আমিন হোসেন (২৫), তাঁর হেলপার রাকিব (২৩), দুর্ঘটনাস্থলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ফোর ব্রাদার্স গার্ড সার্ভিসের ট্রাফিক ম্যান মো. রুবেল (২৮) ও আফরোজ মিয়া (৫০), ঠিকাদার কোম্পানির সেফটি ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার আলী (৩৯), হেভি ইকুইপমেন্ট সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত ইফসকনের মালিক ইফতেখার হোসেন (৩৯), হেড অব অপারেশনস আজহারুল ইসলাম মিঠু (৪৫), ক্রেন সরবরাহকারী বিল্ড ট্রেড কোম্পানির বিপণন ব্যবস্থাপক তোফাজ্জল হোসেন তুষার (৪২), প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন মৃধা (৩৩) ও মঞ্জুরুল ইসলাম (২৯)। রাজধানীর জুরাইন, যাত্রাবাড়ী, কালশী, সাভার এবং গাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও বাগেরহাটে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিজিজিসি থেকে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের ওয়ার্ক অর্ডার পায় ইফসকন। তবে তাদের কাছে বড় ক্রেন না থাকায় তারা বিল্ড ট্রেড কোম্পানির কাছ থেকে ক্রেনটি ভাড়া নেয়। ইফসকনের মালিক ইফতেখার ও কর্মকর্তা মিঠু অপারেটরদের দক্ষতা ও যোগ্যতা এবং ক্রেনটির ফিটনেস যাচাই না করেই গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল সড়কে ভারী গার্ডার স্থাপনের কাজে এটি নিয়োজিত করেছিলেন। এ ছাড়া গার্ডার স্থাপনের সময় অতিরিক্ত একটি সহায়ক ক্রেন রাখার কথা থাকলেও তা ছিল না।

র‌্যাব জানায়, বিল্ড ট্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন ও বিপণন ব্যবস্থাপক তুষার ক্রেনের ভাড়া প্রদান, চুক্তি, চালক নিয়োগ ও ক্রেনের ফিটনেস যাচাইসহ অন্যান্য দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। রুহুল ২০১০ সালে এবং তুষার ২০১৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁরা কোম্পানির অতিরিক্ত লাভের জন্য অল্প পারিশ্রমিকে ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছাড়াই অপারেটর আল আমিনকে নিয়োগ দেন। জুলফিকারের তত্ত্বাবধানে দুর্ঘটনাস্থলে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক ম্যান হিসেবে রুবেল ও আফরোজ নামে দু'জন নিয়োজিত ছিলেন। তাঁরাও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেননি।