মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলে পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। পরে সেই স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতিতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত শামিল হয়েছিলেন। 

আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার’ শীর্ষক আলোচনাসভায় বক্তারা এ কথা বলেন। সভা আয়োজন করে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। এতে সভাপতিত্ব করেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ। এ ছাড়া আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন হক আরা মিনু, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী তারিক সুজাত। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওছার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে চেতনা ও ইতিহাস এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিকে মুছে ফেলে পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি অপশক্তি এখনো তৎপর। এই অপশক্তিকে প্রতিহত করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের কথা বলি। সেটি হলো, মানুষকে সম্মান করতে জানব। যেটি বঙ্গবন্ধু করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেটি করছেন। আমরা অনেক সময় অনেক মানুষকে নানাভাবে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস নিই। সেটি ভালো রাষ্ট্রে জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। 

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নিজেরাই যদি নীতিবিরোধী কাজে সম্পৃক্ত হই, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ইতিহাস বিকৃতি না ঘটানো অধ্যাপকের পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেটি মনে রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি করার চেষ্টা হয়েছে অনেকবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এই কাজের সাথে জড়িত। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই বাংলাদেশ এমনি এমনি হয়নি। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ধরে রাখতে হবে। সবাইকে ঐক্য থাকতে হবে। তবেই আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারব।

তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে নৈতিক অবক্ষয় দেখলে দুঃখ হয়। বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিম্নগামী। এ জন্য ছাত্র রাজনীতি নয় বরং শিক্ষক রাজনীতি দায়ী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি করেছেন। কীসের লোভে করেছেন? কার স্বার্থে এসব হয়েছে? 

ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাবে, সেই নিশ্চয়তা জাতি ও রাষ্ট্র দিতে পারবে। সেই রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছরেরও আমরা সেই শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।

তিনি বলেন, আজ মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সন্তান বাবাকে হত্যা করছে। এখনো সমাজের অস্থিরতা দূর করতে পারিনি। এটি দূর করতে সবার প্রচেষ্টা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যয়ে যেমন দায়িত্ব আছে। আমাদেরও তেমন দায়িত্ব রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা যারা ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বে রয়েছি, ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। কীভাবে নতুন প্রজন্মকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি। 

এ. কে. আজাদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ স্থান, আজকে সেখানেই মেয়েরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা প্রতিকার না করে রাত হলে মেয়েদের বাইরে যেতে নিষেধ করছে। এই শিক্ষা তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেননি।

তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এ দেশের মাটি ও মানুষের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন বলেই এতো বড় নেতা হতে পেরেছেন। তিনি দেশের প্রয়োজনে, জাতির প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়েছেন, আমরা কী পরব? আমরা তার অনুসারী হিসেবে কতটুকু তার আদর্শ ধারণ করতে পেরেছি? 

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার নিয়ে বিশেষ সংখ্যা 'যাত্রিক'-এর মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা।