বড় বোনের বিয়েবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সাদিয়া আফরিন ঊর্মির রেস্তোরাঁয় খাওয়ার বায়না। ছোট বোনের আবদার মেটাতে দল বেঁধে বেরও হলেন সবাই। তবে ইচ্ছা পূরণ আর হলো না। মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে বাসচাপায় পিষ্ট হয়ে ঊর্মি চলে গেলেন অনন্তলোকে। 

আজ মঙ্গলবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ওপর জনপথ এলাকায় ঘটে এই হৃদয়স্পর্শী দুর্ঘটনা। এ ঘটনার পর বিষাদের ছায়া নেমেছে পরিবারে।

২২ বছর বয়সী ঊর্মি রাজধানীর তিতুমীর কলেজের মার্কেটিং বিভাগে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার আহত বেয়াই নাজমুল হক মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। অন্য মোটরসাইকেলে ছিলেন ঊর্মির বোন আইরিন সুলতানা রিনি ও দুলাভাই আজমল হোসেন। দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত কোমল পরিবহনের বাসটি পুলিশ জব্দ করলেও চালক ও সহকারী পালিয়েছেন।

আহত নাজমুল হক জানান, ঊর্মিকে নিয়ে তিনি ফ্লাইওভারের সায়েদাবাদের লুপ ধরে নামতে চেয়েছিলেন। মোড় নেওয়ার সময় হঠাৎ একটি বাস তাঁর মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। এতে দু'জনই ছিটকে পড়েন। সেই বাসটিই চোখের সামনে ঊর্মিকে চাকায় পিষ্ট করে পালানোর চেষ্টা করে।

দুর্ঘটনাস্থলের পেছনে স্বামীর মোটরসাইকেলে ছিলেন ঊর্মির বোন রিনি। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। দ্বিতীয় বিয়েবার্ষিকী উপলক্ষে স্বামী ও দেবরকে নিয়ে দনিয়ায় মায়ের বাসায় বেড়াতে আসেন। এরপর ছোট বোন ঊর্মি বাইরে খাওয়ার আবদার করে। তখন তাঁরা ৩০০ ফিট সড়কের রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার জন্য বের হন। পথেই সব শেষ হয়ে গেল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কাঁদতে কাঁদতে রিনি জানান, তাঁরা পেছনেই ছিলেন। এসে দেখেন ঊর্মির নিথর দেহ ফ্লাইওভারের ওপর পড়ে আছে।

ঊর্মির দুলাভাই আজমল হক জানান, লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মনে হয়েছে, ধাক্কা দেওয়ার পরও বাসটি যদি থেমে যেত, তাহলে এমন সর্বনাশ হতো না। বাসটি পালাতে গিয়েই সাদিয়াকে পিষ্ট করে।

চিকিৎসকদের বরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া জানান, ঊর্মি মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। এতে ঘটনাস্থলে তাঁর মৃত্যু হয়। নাজমুলের হাত ও পায়ের চামড়া উঠে গেছে। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম জানান, জব্দ করা বাসের কাগজপত্রের মাধ্যমে চালক ও সহকারীর নাম-ঠিকানা নিয়ে মামলা করা হবে।

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। ১১.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ফ্লাইওভারে গত তিন বছরে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন অন্তত ১৩৭ জন। এর মধ্যে গত বছর ৪৭ জন মারা যান। তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। ২০২০ সালে ৫৭ জন এবং ২০১৯ সালে ৩৩ জন মারা যান ওই ফ্লাইওভারে।

ফ্লাইওভারটির বিভিন্ন পথে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংয়ের কারণে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া শহরতলিতে চলাচলরত বেশিরভাগ বাসের ব্রেক সমস্যাসহ ফিটনেস না থাকা, মোটরসাইকেলের চালকদের লেন পরিবর্তন এবং উড়াল সড়কের সম্প্রসারণ সংযোগে 'এক্সপ্যানশন জয়েন্টে' অতিরিক্ত ফাঁকা থাকায় মোটরসাইকেলের চাকা আটকেও দুর্ঘটনা ঘটছে। ওই ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে পথচারীদের হেঁটে যাতায়াতের ব্যবস্থা না থাকলেও তাঁদের অবাধ হাঁটা-চলাকেও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছেন ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা।