রোববার সকাল। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয় চত্বরে রুদ্ধশ্বাস নিশ্চলতা। ডিবির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার কক্ষে কালো বোরকায় ঢেকে নীরবে ঢুকলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আলোচিত সেই ছাত্রী; সঙ্গে তাঁর মা। এরপর সেখানে হাজির অপহরণকাণ্ডের 'কারিগর' শাকিল আহমেদ রুবেল। পরনে ঘটনার দিনের সেই খয়েরি রঙের জামা। রুবেলকে দেখেই তেতে উঠলেন ওই তরুণী। চেঁচিয়ে বললেন, 'মা, এই সেই লোক। এই সেই অমানুষটা।' ক্ষোভের দহনে পোড়া মেয়েটি এরপর খানিকটা নীরব। হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে তেড়ে গেলেন। নিজের স্যান্ডেল খুলে রুবেলকে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে ওই ছাত্রী যেন হৃদয় যাতনা কিছুটা কমাতে চাইলেন। কিছু সময় পর আবার চেয়ারে বসে করছিলেন হাঁসফাঁস। তখন মেয়েটির চোখের আঙিনায় জল, মুখয়বে মনস্তাপের বারুদ।

ঢাবির তৃতীয় বর্ষের ছাত্রীকে রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া সেই দুর্ধর্ষ অপহরণকারীকে গ্রেপ্তারের পর তিনি সেই ব্যক্তি কিনা, তা আরও নিশ্চিত হতে ডাকা হয় ভুক্তভোগীকে। যদিও পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তিগত তদন্তে এক ধরনের নিশ্চিত হয়ে রুবেলকে (৪০) গ্রেপ্তার করে। তবু এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনায় ভুক্তভোগীর মাধ্যমে আসামির ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়। সেটা করতে গিয়ে গতকাল হাতের কাছে রুবেলকে পেয়ে যেন প্রথম 'শাস্তিটা' দিয়েই দিলেন ওই ঢাবি ছাত্রী।

পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ওই ছাত্রীর আরেক বোন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। ওই বোন এবার বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছেন। বাবা আগেই গেছেন অনন্তলোকে, দুই বোনকে মানুষ করছেন একা মা। মায়ের স্বপ্ন- ছোট মেয়ে হবে পুলিশ কর্মকর্তা আর বড় মেয়ে প্রশাসনের বিসিএস ক্যাডার। তবে পুলিশ পরিচয়ে অপহরণের পর প্রথমে এই পরিবারের সবার বিশ্বাস ছিল- সত্যি সত্যি কেন পুলিশ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তদন্ত শেষে আসল ঘটনা বেরোলে ভেঙে যায় তাদের ভুল।

রুবেলকে গ্রেপ্তার করার পর গতকাল মিন্টো রোডের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান হারুন অর রশিদ বলেন, রুবেলের নামে বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত ছয়টি মামলার তথ্য মিলেছে। গেল ১০ বছরে দেড় হাজারের মতো ছিনতাই করেছেন তিনি; করেছেন অর্ধশতাধিক মেয়েকে অপহরণ। ছিনতাইয়ের জন্য স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের অপহরণ করে অশালীন আচরণ করা ছিল রুবেলের 'কৌশল'। অপহরণ ও ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর ওই শিক্ষার্থীরা বিষয়টি পুলিশকে জানাতেন না। অপহরণ, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন, ব্যাগ খোয়া যাওয়ার পাশাপাশি অশ্নীল আচরণ করা হলেও লোকলজ্জার ভয়ে তাঁরা বিষয়টি গোপন করতেন। এতে রুবেলের আসল অপরাধ অধিকাংশ সময় চাপা পড়ে যেত।

ডিবিপ্রধান আরও বলেন, ওই ছাত্রীকে পুলিশ পরিচয় দিয়েছিলেন রুবেল। তাঁর কোমরে পিস্তল ছিল; হাতে ছিল ওয়াকিটকি। এ ঘটনার কয়েক দিন আগে পুলিশ পরিচয়ে বরিশালে আরেক মেয়েকে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। এর আগে পূর্বাচল, উত্তরা, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুরসহ আরও কয়েকটি এলাকায় নারীকে অপহরণ করার কথা স্বীকার করেছেন রুবেল। ঢাবি ছাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। ওই ব্যাগে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র ছিল। আমরা পরিচয়পত্র উদ্ধার করেছি। অস্ত্রটি জব্দ করা হয়েছে।

রুবেলকে সহযোগিতার অভিযোগে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন আকাশ শেখ (২২), দেলোয়ার হোসেন (৫৫) ও হাবিবুর রহমান (৩৫)। আকাশের সঙ্গে রুবেলের জেলখানায় পরিচয় হয়।

তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ডিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, রুবেলের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে এখন পর্যন্ত তিন জেলার তথ্য মিলেছে। সেগুলো হলো গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মাদারীপুর। তবে ঢাকায় তাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। ঢাকায় বিভিন্ন হোটেলে থাকতেন তিনি। রুবেল একজন 'মনুষ্যত্বহীন' ব্যক্তি।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত রুবেলের তিনটি বিয়ের তথ্য তাঁরা পেয়েছেন। প্রথম স্ত্রীর নাম শারমিন আক্তার ঊর্মি। তাঁর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের রানীহাটির কৃষ্ণগোবিন্দপুরে। শ্বশুরবাড়ির ওই ঠিকানায় রুবেলের একটি জাতীয় পরিচয় নেওয়ার তথ্য মিলেছে। তবে রুবেলের প্রথম স্ত্রী মাদারীপুরে বাস করেন। যে বাসায় তিনি থাকছেন, সেটি রুবেলের বন্ধু আকাশের। এ ছাড়া রুবেলের তৃতীয় স্ত্রী হলেন রিক্তা আক্তার। তাঁর বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর। রিক্তা বলেন, চার বছর আগে নিজ গ্রাম থেকে গাজীপুর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় এসে সেখানে পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। একদিন গাজীপুর থেকে সাভারে আরেক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। রাস্তায় আসার পর কোনো বাস পাচ্ছিলেন না। তখন এক মোটরসাইকেল চালক তাঁকে সাভারে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রথমে রাজি না হলেও পরে জোর করে তাঁকে মোটরসাইকেলে তোলা হয়। ওই মোটরসাইকেলের চালক ছিলেন রুবেল। রিক্তাকে সেদিন সাভারে তাঁর গন্তব্যে না নিয়ে ওই এলাকায় একটি বাসায় আটকে রাখেন তিনি। পরে ওই বাসার ভেতরে তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি করলে রাতে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন রুবেল। রাজি না হলেও জোর করে ওই রাতে কাজি অফিসে নিয়ে রুবেল তাঁকে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছুদিন পরই টের পান, তাঁর স্বামী একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী। বিচ্ছেদ না হলেও রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ ছিল এত দিন। সপ্তাহখানেক আগে রুবেল হঠাৎ রিক্তার বাবাকে ফোন করে তাঁর মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব দেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল পুলিশকে জানান, ফরিদপুরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের একটি চক্রের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। নেশাজাতীয় ট্যাবলেট খাইয়ে চালকদের হত্যা করে রিকশা ছিনতাই করে ওই গ্রুপটি। আর একটি মামলায় এই মাসের শুরুতে কারাগার থেকে বের হন রুবেল। যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ঢাবি ছাত্রীকে অপহরণ করেছেন তিনি, সেটি গত ১২ আগস্ট দিয়াবাড়ী এলাকা থেকে ছিনতাই করেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাস্তায় কেউ মোটরসাইকেলে করে এসে পুলিশ পরিচয় দিয়ে ধরে নিতে চাইলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে। পুলিশ এভাবে ধরে নেয় না। তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। প্রয়োজন হলে আশপাশের লোকজন জড়ো করে বিষয়টি জানাতে হবে।

গত ২৫ আগস্ট পুলিশ পরিচয়ে থানায় নেওয়ার কথা বলে ঢাবির ওই ছাত্রীকে রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে মোটরসাইকেলে করে তুরাগ থানার দিয়াবাড়ী এলাকায় নিয়ে যান রুবেল। সেখানে ওই তরুণীর স্বর্ণের চেইন, কানের দুলসহ ব্যাগ ছিনিয়ে নেন তিনি। এরপর সেখানে হেনস্তার শিকার হন ওই ছাত্রী।